- ০৮ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ৩০ সেনা নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১৫ জন। বৃহস্পতিবার দেশটির মারিব ও হাদরামাউত অঞ্চলে চালানো এই হামলাকে কয়েক বছরের মধ্যে সরকারি বাহিনীর ওপর হুতিদের সবচেয়ে বড় আক্রমণগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, হামলায় শতাধিক মানুষ হতাহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকটি সামরিক ক্যাম্প ও অস্ত্রভান্ডার ধ্বংস হয়েছে। তার ভাষ্য, সৌদি আরবের বড় ধরনের সামরিক তৎপরতার তথ্য পাওয়ার পর সম্ভাব্য উত্তেজনা মোকাবিলায় এই হামলা চালানো হয়।
তবে হুতিদের দেওয়া হতাহতের বড় সংখ্যার স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করার পর ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র হয়। পরের বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিয়ে সামরিক অভিযানে নামে। ২০২২ সালের জাতিসংঘ-সমর্থিত যুদ্ধবিরতির পর বড় ধরনের সংঘর্ষ অনেকটাই কমে এলেও দুই পক্ষের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
সাম্প্রতিক হামলার পর সেই অস্থির পরিস্থিতি নতুন করে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে মারিব ও হাদরামাউতে সরকারি সামরিক স্থাপনায় হামলা ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের স্থবির সংঘাতকে আবারও সক্রিয় যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষক আহমেদ নাগির মতে, হুতিদের ধারাবাহিক হামলার ফলে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের ঝুঁকি এখন আর দূরের কোনো আশঙ্কা নয়। প্রতিটি নতুন হামলা দুই পক্ষের মধ্যে সংযমের সুযোগ আরও সংকুচিত করছে।
ইয়েমেনের উত্তর-মধ্যাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ মারিবকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সেখানে সামনের সারিতে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
গবেষক আদেল দাশেলার মতে, মারিবের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অঞ্চলটির তেল ও গ্যাসসম্পদকে ঘিরে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামরিক অভিযান হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে স্থলযুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়ছে। এমন যুদ্ধ শুরু হলে আগের সংঘাতের তুলনায় সহিংসতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
হুতিরা এরই মধ্যে জানিয়েছে, ইয়েমেনের ভেতরে সৌদি-সমর্থিত কোনো সামরিক উপস্থিতি তারা মেনে নেবে না। নিজেদের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অধিকার হিসেবে তারা যেকোনো ‘বিরূপ তৎপরতার’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে।
ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনার পাশাপাশি হুতিদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও জটিল করে তুলেছে। সৌদি আরবের স্থাপনা এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলকে ঘিরে তাদের সাম্প্রতিক তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ ও সীমান্তপারের হামলা একই সঙ্গে চলতে থাকলে ইয়েমেনের সংঘাত আবার আঞ্চলিক মাত্রা নিতে পারে। এতে বাণিজ্যিক নৌপথ, জ্বালানি সরবরাহ এবং আশপাশের দেশগুলোর নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইয়েমেন সরকার ও সৌদি আরব এখন পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তবে হুতিদের নতুন হামলার পর সেই কৌশল কতদিন কার্যকর রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক উত্তেজনা যত বাড়বে, ততই দুই পক্ষের ওপর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ বাড়বে। সীমিত সামরিক অভিযান থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ কোন পথে পরিস্থিতি এগোবে, তা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে পরবর্তী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহের ওপর।
ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জন্যও নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সংঘাতে বিপর্যস্ত দেশটিতে বহু মানুষ এখনও নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকটে রয়েছে। ফলে সংঘাত আবার তীব্র হলে মানবিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।