Saturday, August 8, 2026

৪০ ডিগ্রির দাবদাহে রোমের রাস্তায় ৩০০ মানুষের রাতযাপন, ঘরে ফেরার অপেক্ষায় ১৪০ পরিবার


ছবিঃ ৪৯ বছর বয়সী মারিয়া ক্যাব্রেরা যিনি ২০১৩ সাল থেকে ‘স্পিন টাইম’-এ বসবাস করছেন রোমে সিলগালা করা ভবনের বাইরে আয়োজিত অবস্থান কর্মসূচির একটি তাঁবুতে বসে আছেন; ৬ আগস্ট, ২০২৬ (সংগৃহীত । আল জাজিরা /সিমন মান্দা)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN

ইতালির রাজধানী রোমে তীব্র দাবদাহের মধ্যেই ফুটপাতে রাত কাটাচ্ছেন প্রায় ৩০০ মানুষ। তাদের মধ্যে রয়েছে প্রায় ১০০ শিশু। গত ২৯ জুলাই থেকে শহরের টার্মিনি রেলস্টেশনের কাছাকাছি একটি ভবনের বাইরে এভাবেই অবস্থান করছেন তারা।

দিনের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ায় খোলা আকাশের নিচে থাকা এসব মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। ভবনটির সাবেক বাসিন্দা ৬৮ বছর বয়সী আনা বিজদোয়াকা বলেন, টানা কয়েক রাত ঘুমহীন কাটানোর পর এখন ফুটপাতে একটি গদি পাওয়ার আশাও ছেড়ে দিয়েছেন তারা। তার ভাষায়, “আমাদের হৃদয় যেন টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।”

যে ভবনের সামনে তারা অবস্থান করছেন, সেটির নাম ‘স্পিন টাইম’। সাততলা ভবনটি ২০১৩ সালে দখলে নেওয়ার পর ধীরে ধীরে একটি বড় আবাসিক ও সামাজিক সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। বর্তমানে সেখানে ২০টির বেশি দেশের প্রায় ১৪০টি পরিবার বসবাস করত। বাসিন্দাদের কাছে ভবনটি শুধু থাকার জায়গা নয়, বরং একটি পরিবারের মতোই ছিল।

গত ২৯ জুলাই ভবনটির নিচতলার একটি খালি কক্ষে অল্প সময়ের জন্য আগুন লাগে। বাসিন্দারাই কয়েক মিনিটের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে দমকল বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। আগুনে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হলেও পুলিশ ভবনটি খালি করে দেয় এবং আদালতের নির্দেশে সেটি জব্দ করা হয়।

পরে ভবনটিকে বসবাসের অনুপযোগী ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে বাসিন্দাদের একবারে একজন করে পুলিশের পাহারায় ভবনে ঢুকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ব্যক্তিগত সামগ্রী নিয়ে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।

এর পর থেকেই ভবনের সামনের ফুটপাতই তাদের অস্থায়ী আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা প্রতিদিন খাবার, পানি, গদি ও পোশাক নিয়ে সেখানে আসছেন। গত কয়েক দিনে হাজারো মানুষ তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। রাজনীতিকদের পাশাপাশি সংগীতশিল্পী ও অভিনয়শিল্পীরাও সেখানে গিয়ে সংহতি জানিয়েছেন। শিশুদের জন্য সন্ধ্যায় খোলা আকাশের নিচে সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

ভবন খালি করার প্রথম রাতের অভিজ্ঞতা ছিল আরও ভয়াবহ। অনেক বাসিন্দার পায়ে জুতা পর্যন্ত ছিল না। ভোররাতে তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়, তারা আর ভবনে ফিরতে পারবেন না।

প্রায় ১১ বছর ধরে সেখানে বসবাসকারী মারিয়া ক্যাব্রেরা বলেন, “আমাদের কেউ কেউ প্রায় ৪০ ঘণ্টা পায়ে দাঁড়িয়ে ছিল। শিশুদের রাস্তায় পড়ে থাকা কার্ডবোর্ডের ওপর শুয়ে থাকতে দেখা ছিল ভয়াবহ।”

গত ৬ আগস্ট পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। দুই বছরের একটি শিশু প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে রেড ক্রসের এক নার্সের কোলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে।

এক কুর্দি বাসিন্দা জানান, ঘটনাটি দেখে তিনি প্রায় দুই ঘণ্টা কেঁদেছেন। তার ভাইও ওই ভবনে থাকতেন। তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন। আগে প্রতিবেশীরা নিয়মিত তার খোঁজ নিতেন। ভবন খালি করার পর তাকে এখন প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বাইরে বসে থাকতে হচ্ছে।

মারিয়া ক্যাব্রেরা জানান, চাকরি হারানোর পর বাড়িভাড়া দিতে না পেরে তিনি স্পিন টাইমে আশ্রয় নিয়েছিলেন। শুরুতে বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে বসবাস করা সহজ ছিল না। তবে সময়ের সঙ্গে তারা পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন।

স্পিন টাইম শুধু আবাসিক ভবন ছিল না। সেখানে বিনামূল্যে কো-ওয়ার্কিং স্পেস, তরুণদের পরিচালিত সংবাদপত্র, কনসার্ট, নাটকসহ নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন হতো। ক্যাব্রেরা জানান, ভবনটিতেই তিনি জীবনে প্রথমবার শাস্ত্রীয় সংগীতের অনুষ্ঠান দেখেছিলেন যা বাইরে গিয়ে দেখা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

২০১৯ সালে ভবনটি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে। বিপুল বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর পোপের দাতব্য কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা কার্ডিনাল কনরাড ক্রাজেভস্কি নিজে ম্যানহোলে নেমে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেন।

বাসিন্দাদের ভবনে ফেরানোর পথ খুঁজতে রোমের মেয়র রবার্তো গুয়ালতিয়েরি ভবনটি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। গত ৩ আগস্ট মেয়র, পুলিশপ্রধান, আবাসনবিষয়ক কর্মকর্তা ও রোমের ডায়োসিসের ভিকার জেনারেল কার্ডিনাল বালদাসারে রেইনাকে নিয়ে বৈঠক হয়।

সিটি করপোরেশনের প্রস্তাব ছিল, ভবনটি কেনার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় বাসিন্দাদের সেখানে ফেরার সুযোগ দেওয়া হবে।

কিন্তু বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফা বৈঠকের পর মেয়র জানান, ভবনটির মালিকপক্ষ সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

ভবনটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ইনভেস্টিরে এসজিআর এক বিবৃতিতে জানায়, দীর্ঘ ১৩ বছর দখলে থাকার পর ভবনটি বর্তমান অবস্থায় নিরাপত্তার মান পূরণ করছে না। ফলে আইনগতভাবে শহর কর্তৃপক্ষের কাছে ভবনটির দখল হস্তান্তর করা সম্ভব নয়। তবে ভবন বিক্রির বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে তারা আগ্রহী।

মেয়র গুয়ালতিয়েরি জানিয়েছেন, আগামী সোমবার থেকে ভবনটির বাসিন্দাদের বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করার সক্ষমতা তৈরি হবে।

তবে দীর্ঘদিনের বাসিন্দারা সেই প্রস্তাব মেনে নিতে নারাজ। তাদের দাবি, তারা স্পিন টাইমেই ফিরতে চান। ভবনটি খালি করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তারা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

ভবনটি ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন ডানপন্থী ব্রাদার্স অব ইতালি পার্টি সরকারি অর্থে ভবনটি কেনার বিরোধিতা করেছে। তাদের যুক্তি, হাজারো মানুষ যখন সরকারি আবাসনের অপেক্ষায় রয়েছেন, তখন একটি অবৈধ দখলকে পুরস্কৃত করতে জনগণের অর্থ ব্যয় করা উচিত নয়।

এদিকে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে ভ্যাটিকানও। সম্প্রতি পোপ লিও চতুর্দশ স্পিন টাইমের বাসিন্দাদের কয়েকজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। কার্ডিনাল রেইনা জানিয়েছেন, পোপকে পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য নিয়মিত জানানো হচ্ছে।

স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করা হলে স্পিন টাইম ইতালিতে সবচেয়ে বড় আবাসিক দখল উচ্ছেদের ঘটনায় পরিণত হতে পারে।

এ অবস্থায় বাসিন্দাদের দাবি একটাই তারা নিজেদের ঘরে ফিরতে চান।

ক্যাব্রেরা বলেন, “আমি একটি অলৌকিক ঘটনার অপেক্ষায় আছি। আমি মনে করি না, গরিব হওয়া কোনো অপরাধ।”

তার ভাষায়, বাইরে থেকে ভবনটি হয়তো একটি সাধারণ স্থাপনা। কিন্তু তাদের কাছে এটি বহু বছরের জীবন, সম্পর্ক ও স্মৃতির ঠিকানা।

“আমরা চারটি দেয়াল তৈরি করেছিলাম। আমাদের কাছে সেটাই ছিল ঘর। আর আমরা সেই ঘরেই ফিরে যেতে চাই,” বলেন তিনি।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন