Saturday, October 24, 2026

প্রাথমিকের ৪৮ শতাংশ শিক্ষার্থী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, কিন্ডারগার্টেনেই ৫০ লাখ


প্রতীকী ছবিঃ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা

দেশে প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত দুই কোটির বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে ২৫ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এর মধ্যে প্রায় ৯৬ লাখ শিক্ষার্থী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরে বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পড়ছে, যা মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৪৮ শতাংশ। শুধু কিন্ডারগার্টেনেই রয়েছে ৫০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী। প্রাথমিক শিক্ষায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এই বড় অংশগ্রহণের ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, তদারকি ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করা নিয়ে নতুন করে গুরুত্ব তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘শিক্ষা জরিপ ২০২৫’ প্রতিবেদনে প্রাথমিক শিক্ষার এ চিত্র উঠে এসেছে। এতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) পরিচালিত ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারির তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থী ২ কোটি ১ লাখের বেশি। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২ জন। অন্যদিকে, কিন্ডারগার্টেন, বেসরকারি বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, এনজিও পরিচালিত স্কুলসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে রয়েছে প্রায় ৯৬ লাখ শিক্ষার্থী।

দেশে এ স্তরের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, বেসরকারি বিদ্যালয়, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, উচ্চ মাদ্রাসা ও উচ্চ বিদ্যালয়সংলগ্ন প্রাথমিক বিভাগ, এনজিও স্কুল, শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালিত স্কুল এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান।

শিক্ষা জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৫ হাজার ৫৬৭টি। এর বাইরে কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা ২৬ হাজার ২৯৯টি। এ ছাড়া উচ্চ মাদ্রাসাসংলগ্ন ইবতেদায়ি বিভাগ ৯ হাজার ৪০৬টি, বেসরকারি বিদ্যালয় ৫ হাজার ১৮৭টি, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ৩ হাজার ৪১৩টি এবং এনজিও পরিচালিত স্কুল ২ হাজার ৮৩১টি।

উচ্চ বিদ্যালয়সংলগ্ন প্রাথমিক বিভাগ রয়েছে ২ হাজার ৭৬৭টি। এ ছাড়া এনজিও লার্নিং সেন্টার ১ হাজার ৭২৭টি, শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালিত স্কুল ২০৫টি এবং অন্যান্য শ্রেণিভুক্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১ হাজার ২০৫টি।

তবে কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্যও রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন দেশে ৩২ হাজার কিন্ডারগার্টেন থাকার তথ্য জানিয়েছিলেন। ফলে বিভিন্ন উৎসের তথ্য অনুযায়ী এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যায় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শিক্ষার্থীর হিসাবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরই বড় অবস্থানে রয়েছে কিন্ডারগার্টেন। এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ছে ৫০ লাখ ৮ হাজার ৮৫০ জন শিক্ষার্থী। সেখানে শিক্ষক রয়েছেন ১ লাখ ৯৮ হাজার ৩৭৪ জন।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৪ জন। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২। উচ্চ মাদ্রাসাসংলগ্ন ইবতেদায়ি বিভাগে ১৪ লাখ ৩২ হাজার ১২৭ জন শিক্ষার্থী এবং ৩১ হাজার ১৮৩ জন শিক্ষক রয়েছেন।

উচ্চ বিদ্যালয়সংলগ্ন প্রাথমিক বিভাগে শিক্ষার্থী ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৮৯৬ জন। বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়ছে ৬ লাখ ৮৬ হাজার ১৯৫ জন। ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ জন এবং এনজিও স্কুলে ৪ লাখ ৯১ হাজার ৫২৯ জন।

এনজিও লার্নিং সেন্টারে শিক্ষার্থী রয়েছে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৭৫৩ জন। শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালিত স্কুলে ২৭ হাজার ৬৮১ জন এবং অন্যান্য শ্রেণিভুক্ত প্রতিষ্ঠানে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫৫৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।

ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষক রয়েছেন ৭ লাখ ৭ হাজার ২১৬ জন। তাঁদের মধ্যে নারী ৪ লাখ ৩৭ হাজার ২ এবং পুরুষ ২ লাখ ৭০ হাজার ২১৪ জন। অর্থাৎ মোট শিক্ষকের ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ নারী।

তবে প্রতিষ্ঠানভেদে নারী শিক্ষকের হার উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক ৬৫ দশমিক ৯ শতাংশ। বেসরকারি বিদ্যালয়ে এ হার ৬৪ শতাংশ এবং কিন্ডারগার্টেনে ৬২ দশমিক ১ শতাংশ।

অন্যদিকে, ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় নারী শিক্ষকের হার ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং উচ্চ মাদ্রাসাসংলগ্ন ইবতেদায়ি বিভাগে মাত্র ২০ দশমিক ৪ শতাংশ। এনজিও লার্নিং সেন্টারগুলোতে নারী শিক্ষকের হার সবচেয়ে বেশি, ৯৩ দশমিক ২ শতাংশ।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সব ধরনের প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ৯৮ লাখ ৫৩ হাজার ৯৬২ জন এবং ছাত্রী ১ কোটি ৩ লাখ ২৯ হাজার ৮৬ জন।

শুধু প্রাথমিক শ্রেণিগুলোতেই নয়, প্রাক্‌-প্রাথমিক স্তরেও সরকারি বিদ্যালয়ের বাইরে শিশুদের অংশগ্রহণ বেশি। ২০২৪ সালে এ স্তরে মোট শিক্ষার্থী ছিল ৩৪ লাখ ৯৬ হাজার ৪২৩ জন।

এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল ১৬ লাখ ৩২ হাজার ৪২৬ জন, যা মোট শিক্ষার্থীর ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে, কিন্ডারগার্টেনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিল ১৮ লাখ ৬৩ হাজার ৯৯৭ জন শিশু। অর্থাৎ প্রাক্‌-প্রাথমিক স্তরের ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ শিশুই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরে পড়াশোনা শুরু করেছে।

প্রতিষ্ঠানভিত্তিক হিসাবে, কিন্ডারগার্টেনে প্রাক্‌-প্রাথমিক পর্যায়ে ভর্তি হয়েছিল ১২ লাখ ৪৮ হাজার ১৫৭ জন শিশু। এ ছাড়া উচ্চ বিদ্যালয়সংলগ্ন প্রাথমিক বিভাগে ১ লাখ ৬৯ হাজার ১৫৮ জন, বেসরকারি বিদ্যালয়ে ১ লাখ ১২ হাজার ৫৫৬ জন এবং এনজিও স্কুলে ১ লাখ ১১ হাজার ৫৯০ জন শিশু ভর্তি হয়েছিল।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করায় এসব বিদ্যালয়ের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার মান নিশ্চিত করা এবং সরকারি পাঠ্যক্রম অনুসরণ করানোর বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা জানিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শাহীনা ফেরদৌসী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বেসরকারি পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি আইন ও বিধিমালার আওতায় আসতে হবে। এ জন্য প্রথমে নিবন্ধন করতে হবে এবং পরে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পূর্ণ নিবন্ধন নিতে হবে।

তিনি জানান, বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। জেলা, বিভাগ ও উপজেলা পর্যায়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এসব প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের জন্য উৎসাহিত করছেন।

শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সব বেসরকারি বিদ্যালয়কে নিবন্ধিত হতে হবে। নিবন্ধনের আওতায় এলে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদারকি করা সহজ হবে এবং সরকারি বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রমেও তাদের যুক্ত করা সম্ভব হবে।

আগে নিবন্ধনের আবেদনপ্রক্রিয়া অফলাইনে পরিচালিত হলেও এখন তা অনলাইনে সহজ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এতে আগের তুলনায় বেশি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিবন্ধনের আওতায় আসছে। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগও পাচ্ছে। যেমন, আগে যেসব প্রতিষ্ঠান বৃত্তি কার্যক্রমে অংশ নিতে পারত না, নিবন্ধনের ফলে তাদের সে সুযোগ বেড়েছে।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আরও বলেন, বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোকে সরকার নির্ধারিত পাঠদান পদ্ধতি অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি পাঠ্যবই ব্যবহারসহ নির্ধারিত শিক্ষাক্রম অনুসরণে এসব প্রতিষ্ঠানকে উদ্বুদ্ধ করতে প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিবন্ধন, নিয়মিত তদারকি এবং পাঠদানের মান নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে সরকারি নীতিমালার আওতায় আনার উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর প্রাথমিক শিক্ষার মান ও সমতা নিশ্চিত করার অগ্রগতি।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন