- ০৪ জুন, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। বরিশাল
খামারে প্রবেশের আগে হাত-পা ধোয়া, জীবাণুমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং নির্দিষ্ট জুতা ব্যবহার—এসব নিয়ম যেন কোনো চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ। তবে বাস্তবে এটি একটি ব্রয়লার মুরগির খামার। বরিশালের চরকাউয়া ইউনিয়নের কর্ণকাঠি গ্রামে এমনই ব্যতিক্রমী ব্যবস্থাপনায় অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াই উৎপাদন করা হচ্ছে ব্রয়লার মুরগি।
২০২৩ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ বর্তমানে নিরাপদ পোলট্রি উৎপাদনের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতাধীন আঞ্চলিক প্রাণিরোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারের কারিগরি সহায়তায় কর্ণকাঠি গ্রামে গড়ে তোলা হয়েছে ‘মডেল পোলট্রি ভিলেজ’, যেখানে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও কঠোর বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থার মাধ্যমে মুরগি পালন করা হচ্ছে।
শুরুতে সীমিত সংখ্যক খামারিকে নিয়ে প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে এর পরিধি বেড়েছে। নিরাপদ উৎপাদন পদ্ধতি এবং অর্থনৈতিক সুফল দেখে আশপাশের অনেক খামারিও এখন এই উদ্যোগে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রচলিত খামার ব্যবস্থায় রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রায়ই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হলেও কর্ণকাঠির খামারগুলোতে পরিচ্ছন্নতা, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও রোগ প্রতিরোধমূলক বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে রোগের ঝুঁকি ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এ প্রকল্পের আওতায় খামারিদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। মুরগির স্বাস্থ্যসুরক্ষা, খামার পরিচর্যা, রোগ প্রতিরোধ এবং অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার এড়ানোর বিষয়ে তাদের সচেতন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত বায়োসিকিউরিটি নির্দেশনা অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কর্ণকাঠির তরুণ উদ্যোক্তা শাওন সরদার জানান, তার খামারের তিনটি শেডে প্রায় তিন হাজার ব্রয়লার মুরগি রয়েছে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও সঠিক ব্যবস্থাপনার কারণে মুরগিগুলো সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে। এতে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকছে এবং লাভও বাড়ছে। পাশাপাশি স্থানীয় কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
খামারিদের দাবি, অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াই উৎপাদিত মুরগির মাংসের স্বাদ ও মান ভালো হওয়ায় বাজারে এর চাহিদাও বাড়ছে। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এসব মুরগি সরবরাহ করা হচ্ছে।
আঞ্চলিক প্রাণিরোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ইব্রাহিম খলিল বলেন, পোলট্রি খাতে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সেই ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যেই এ মডেল গ্রাম গড়ে তোলা হয়েছে এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক নূরুল আলমের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং কার্যকর বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা অনুসরণ করলে অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াও নিরাপদ ও মানসম্পন্ন ব্রয়লার উৎপাদন সম্ভব। কর্ণকাঠির খামারগুলো সেই সম্ভাবনার বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ ধরনের উদ্যোগ দেশের পোলট্রি শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।