- ০৬ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জিতেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও প্রগতিশীল রাজনীতিক আবদুল এল-সায়েদ। দীর্ঘ সময় ধরে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর ভোট গণনা শেষ হলে তিনি অল্প ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করেন।
নির্বাচনী লড়াইটি শুধু দুই প্রার্থীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভবিষ্যৎ নীতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও গাজা ইস্যুতে দলের অবস্থান নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
এই প্রাইমারি নির্বাচনে মোট প্রচারণা ব্যয় ৬০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি ছাড়িয়ে যায়। এর বড় একটি অংশ ব্যয় করে ইসরায়েলপন্থী প্রভাবশালী লবি AIPAC, যারা প্রকাশ্যে হ্যালি স্টিভেন্সের পক্ষে অবস্থান নেয়। সংস্থাটি একাই স্টিভেন্সের প্রচারণায় ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি সমর্থন দেয়। তবুও শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হন এল-সায়েদ।
নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মূল নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক কংগ্রেসম্যান মাইক রজার্সের মুখোমুখি হবেন এল-সায়েদ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মিশিগান দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্য। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হয়েছিলেন। ফলে আসন্ন সিনেট নির্বাচন জাতীয় রাজনীতিতেও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
মিসরীয় বংশোদ্ভূত আবদুল এল-সায়েদ নভেম্বরে বিজয়ী হলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এ কারণে তার এই জয়কে অনেকেই ঐতিহাসিক সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে দেখছেন।
গাজা যুদ্ধ নিয়ে এল-সায়েদের অবস্থানও তাকে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তিনি গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করে এটিকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তি দিয়েছেন, বিদেশে সংঘাতের পেছনে ব্যয় করা অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করা উচিত।
আরব-আমেরিকান অধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা বলছেন, নেতিবাচক প্রচারণা ও ব্যক্তিগত আক্রমণের পরিবর্তে ভোটাররা নীতিগত বিষয়কেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের মতে, নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করেছে যে পরিচয়ভিত্তিক প্রচারণা সব সময় ভোটারদের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে না।
ভোটের ফল নিশ্চিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এল-সায়েদ লেখেন, "মিশিগান, আমরা জিতেছি। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনীত প্রার্থী হতে পেরে আমি গর্বিত। এবার নভেম্বরের লড়াই জিততে হবে।"
অন্যদিকে পরাজয়ের পরই হ্যালি স্টিভেন্স বিজয়ী প্রতিদ্বন্দ্বীকে অভিনন্দন জানিয়ে তার প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আবদুল এল-সায়েদ একজন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা, রোডস স্কলার এবং মিশিগানের নিবেদিতপ্রাণ নাগরিক। রিপাবলিকান প্রার্থীর বিরুদ্ধে তার প্রচারণায় তিনি পাশে থাকবেন।
মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমার এবং সিনেটর গ্যারি পিটার্স, যারা প্রাইমারিতে স্টিভেন্সকে সমর্থন দিয়েছিলেন, তারাও এখন মূল নির্বাচনে এল-সায়েদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
বিজয়ের পর সমর্থকদের উদ্দেশে এল-সায়েদ দলীয় বিভাজন ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রাইমারির প্রতিযোগিতা শেষ হয়েছে, এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত আরও বড় ও শক্তিশালী একটি রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা, যাতে পুরো ডেমোক্র্যাটিক শিবির একসঙ্গে নভেম্বরের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
একই সঙ্গে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে লক্ষ্য করে বলেন, আগামী নির্বাচনে তাদের প্রচারণা হবে আরও আক্রমণাত্মক এবং জনগণের স্বার্থের প্রশ্নেই সেই লড়াই পরিচালিত হবে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এল-সায়েদের বিজয়কে রিপাবলিকানদের জন্য "সুসংবাদ" বলে মন্তব্য করেন। একই পোস্টে তিনি ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও এল-সায়েদের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় সমালোচনাও করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মিশিগানের এই প্রাইমারি নির্বাচন শুধু একটি প্রার্থী নির্ধারণের লড়াই নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতিতে গাজা ইস্যু, ইসরায়েল নীতি এবং দলীয় তৃণমূলের পরিবর্তিত মনোভাবেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।