- ০৬ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
চীনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা যাচাই করতে বিশেষ মহড়ায় অংশ নিয়েছেন তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে। সাঁজোয়া কর্মীবাহী যান (আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার) ব্যবহার করে গভীর রাতে তাকে নিরাপদ কমান্ড সেন্টারে নেওয়া হয়, যেখানে তিনি শীর্ষ সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার অনুশীলনে অংশ নেন।
এটি তাইওয়ানের বার্ষিক হান কুয়াং সামরিক মহড়ার অংশ। ১০ দিনব্যাপী এই মহড়ার মূল লক্ষ্য, চীনের সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসনের মুখে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সরকারি কার্যক্রম এবং জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা।
প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, মহড়ায় প্রেসিডেন্ট লাই বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরে অংশ নেন। নিরাপদ কমান্ড সেন্টারে পৌঁছে তিনি প্রতিরক্ষা পরিচালনা, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং সংকটকালেও প্রশাসনের ধারাবাহিক কার্যক্রম বজায় রাখার কৌশল পর্যালোচনা করেন।
প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র ক্যারেন কুও বলেন, এই অনুশীলনের উদ্দেশ্য ছিল অপ্রত্যাশিত যেকোনো পরিস্থিতিতে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো, বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয় এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা।
তাইওয়ানের ইতিহাসে এই প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে লাই চিং-তে 'ওয়ান চুন' নামে পরিচিত বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনায় অংশ নিলেন। শীতল যুদ্ধের সময় থেকে চালু থাকা এই পরিকল্পনার আওতায় যুদ্ধ বা বড় ধরনের জাতীয় সংকট দেখা দিলে রাষ্ট্রপ্রধানকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে সেখান থেকেই সরকারের কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা রাখা হয়।
১৯৪৯ সালে গৃহযুদ্ধের পর জাতীয়তাবাদী সরকার তাইওয়ানে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই দ্বীপটির নিরাপত্তা কৌশলে এই পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ান বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন যে সংঘাত শুরু হলে চীন প্রথমেই দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে তথাকথিত 'ডিক্যাপিটেশন' বা নেতৃত্ব অকার্যকর করার অভিযান চালাতে পারে। ২০২৩ সালে তাইওয়ান ঘিরে চীনের সামরিক মহড়ার সময় বেইজিংয়ের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমেও এমন ধরনের হামলার অনুশীলনের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
এদিকে চলমান হান কুয়াং মহড়ায় তাইওয়ানের বিভিন্ন স্থানে সেনা সদস্য ও আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে। উপকূলীয় প্রতিরক্ষা জোরদার করতে কোস্টগার্ডের একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা সংযোজনের কার্যক্রমও পর্যবেক্ষণ করেন প্রেসিডেন্ট লাই।
রাজধানী তাইপের সং সান বিমানবন্দর এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছাকাছি এলাকায় দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি তিয়েন-কুং-৩ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করতে দেখা গেছে। এই ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সক্ষমতা রাখে।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এবারের মহড়ায় বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতির আদলে ধারাবাহিক অনুশীলনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি যাচাই করা হচ্ছে। এতে উপকূল প্রতিরক্ষা, সম্ভাব্য অবরোধ মোকাবিলা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষা এবং বেসামরিক জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে।
আগামী সপ্তাহে প্রথমবারের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর থাকে, সেটিও পরীক্ষা করা হবে। সরকারের আশা, দুর্যোগ কিংবা যুদ্ধের সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত হয়ে গেলেও বিকল্প উপায়ে নাগরিকদের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে চীনের সামরিক বাহিনী এখনো এই মহড়া নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মহড়া শুরুর দিনই দ্বীপটির আশপাশে ১৪টি চীনা সামরিক বিমান এবং ৯টি যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।
বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের হুমকিও দিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে বারবার বলেছেন, তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র দ্বীপটির জনগণেরই রয়েছে। দুই পক্ষের এই অবস্থানগত বিরোধের মধ্যেই তাইওয়ানের সর্ববৃহৎ সামরিক প্রস্তুতি নতুন করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।