Thursday, August 6, 2026

হরমুজ নিয়ে কূটনৈতিক অগ্রগতি, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান


ছবিঃ প্রস্তাবিত হরমুজ চুক্তি অনুযায়ী ইরান সেখানে প্রবেশকারী নৌ-চলাচলের নিয়ন্ত্রণ পাবে বলে সূত্র জানিয়েছে (সংগৃহীত । আল জাজিরা)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

মধ্যপ্রাচ্যে পাঁচ মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের অবসান ঘটাতে ওমানের মধ্যস্থতায় নতুন একটি সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক আঞ্চলিক ও ইরানি সূত্রের দাবি, প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর ইরানকে বিশেষ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

যদি এমন সমঝোতা কার্যকর হয়, তবে এটি শুধু যুদ্ধ-পরবর্তী কূটনৈতিক অগ্রগতি নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবেও বিবেচিত হবে। কারণ যুদ্ধের আগে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ অবাধে চলাচল করত এবং কোনো ধরনের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বা ফি আরোপের ব্যবস্থা ছিল না।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ইরান ও ওমান দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নৌযান চলাচল নিয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে আসছে। প্রণালিটির উত্তরাংশ ইরানের এবং দক্ষিণাংশ ওমানের জলসীমার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় উভয় দেশের সমন্বয়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরানের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং এমন একটি কাঠামো নিয়ে সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছানো গেছে, যেখানে উপসাগরে প্রবেশ ও বের হওয়া—উভয় দিকের বাণিজ্যিক জাহাজই ইরানের জলসীমা ব্যবহার করবে।

তবে বিষয়টি নিয়ে এখনো ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা খুব শিগগিরই হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকর্তা অতীতে বারবার জানিয়েছেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটের ওপর ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, সমঝোতার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিশেষ করে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বলতে কী বোঝানো হবে, জাহাজ তল্লাশির দায়িত্ব কার হাতে থাকবে এবং কোনো ধরনের ফি আদায় করা হলে তা কীভাবে নির্ধারিত হবে—এসব প্রশ্নে এখনো মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানান, ইরান হরমুজ ব্যবহারকারী জাহাজের বহন করা পণ্যের মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে ওমান তুলনামূলক কম, প্রায় ৩ শতাংশ ফি নির্ধারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, আন্তর্জাতিক এই নৌপথে কোনো অতিরিক্ত ফি আরোপ করা উচিত নয়।

এদিকে আলোচনার সমান্তরালে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে কঠোর বার্তাও দিয়েছে। একাধিক আঞ্চলিক সূত্রের দাবি, তেহরান সতর্ক করেছে যে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার ইরানের ভেতরে সামরিক হামলা চালায়, তাহলে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা ও কৌশলগত অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

সূত্রগুলোর ভাষ্য, ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তাদের অবকাঠামোতে হামলা হলে এর জবাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক মিত্রদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাতেও দেওয়া হবে।

এরই মধ্যে সংঘাত চলাকালে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী কিছু বাণিজ্যিক জাহাজের ওপরও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে লাস ভেগাসে এক সমাবেশে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, তিনি সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দিতে চান। তার ভাষায়, যুদ্ধের চেয়ে সমঝোতার মাধ্যমে সংকটের সমাধানই সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পথ।

ইরানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে দেশটিতে তিন হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, একই সময়ে তাদের ১৮ জন সামরিক সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে সম্ভাব্য এই সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে তা শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেই নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। তবে চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আলোচনার ফলাফল নিয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন