- ০৬ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
লেবাননের সাংবাদিক আমাল খলিল নিহতের ঘটনাকে পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক নাগরিককে লক্ষ্য করে চালানো হামলা হিসেবে উল্লেখ করে এটিকে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ আখ্যা দিয়েছে আন্তর্জাতিক তিনটি মানবাধিকার সংস্থা। একই সঙ্গে ঘটনাটির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত পৃথক তদন্ত প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ), অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং লিগ্যাল এজেন্ডা দাবি করেছে, চলতি বছরের ২২ এপ্রিল দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর ধারাবাহিক হামলায় সাংবাদিক আমাল খলিল নিহত এবং তার সহকর্মী জেইনাব ফারাজ গুরুতর আহত হন। সংগঠনগুলোর মতে, হামলার সময় ইসরায়েলি বাহিনীর জানা থাকার কথা ছিল যে তারা সশস্ত্র যোদ্ধা নন, বরং দায়িত্ব পালনরত বেসামরিক সাংবাদিক।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়েছে, হামলার পর আহত সাংবাদিকদের উদ্ধারে লেবাননের উদ্ধারকর্মীদের কয়েক ঘণ্টা প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এমনকি উদ্ধার অভিযানের সময় লেবাননের রেড ক্রসের কর্মীদের লক্ষ্য করে স্টান গ্রেনেড নিক্ষেপ এবং অ্যাম্বুলেন্সে গুলিবর্ষণের অভিযোগও আনা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, দ্রুত উদ্ধার সম্ভব হলে আমাল খলিলের জীবন রক্ষা করা যেতে পারত। হাসপাতালের চিকিৎসা নথির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবন ধসে চাপা পড়ার পরও তিনি কয়েক ঘণ্টা জীবিত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের লেবাননবিষয়ক গবেষক রামজি কাইস বলেন, তদন্তে এমন তথ্য মিলেছে যা ইঙ্গিত করে যে হামলার আগে কিংবা হামলার সময় ইসরায়েলি বাহিনীর জানা থাকার কথা ছিল—খলিল ও ফারাজ দুজনই বেসামরিক সাংবাদিক। তারপরও তাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় এবং পরে উদ্ধার কার্যক্রমেও বাধা দেওয়া হয়।
তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, সাংবাদিকদের ক্ষয়ক্ষতিতে তারা দুঃখ প্রকাশ করছে। তাদের দাবি, ওই এলাকায় হিজবুল্লাহর দুই সদস্যকে লক্ষ্য করে পরিচালিত অভিযানের ধারাবাহিক ঘটনায় সাংবাদিকরা হতাহত হন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তদন্তে উঠে এসেছে, ২২ এপ্রিল সাংবাদিক আমাল খলিল ও ফ্রিল্যান্স ক্যামেরাপারসন জেইনাব ফারাজ দক্ষিণ লেবাননের আল-তিরি গ্রামে গিয়েছিলেন, সেখানে ইসরায়েলি সেনারা অবস্থান ছেড়েছে কি না, তা যাচাই করতে। গ্রামে প্রবেশের কিছুক্ষণ পর তাদের সামনে থাকা একটি গাড়িতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়, যাতে দুই ব্যক্তি নিহত হন।
এরপর খলিল জরুরি উদ্ধারসেবায় ফোন করে সহায়তা চান। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত অনুমতির অপেক্ষায় উদ্ধারকারী দল দীর্ঘ সময় গ্রামে প্রবেশ করতে পারেনি।
পরবর্তীতে সাংবাদিকরা নিজেদের গাড়ি ছেড়ে একটি ভবনে আশ্রয় নেন। কিছুক্ষণ পর তাদের গাড়িতেও হামলা চালানো হয়। এতে দুজনই আহত হন। আহত অবস্থায় তারা কাছের ভবনে আশ্রয় নিলেও বিকেলে সেই ভবনেও আরেকটি বিমান হামলা চালানো হয়। ভবন ধসে আমাল খলিল ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন এবং জেইনাব ফারাজ গুরুতর আহত হন।
পরে উদ্ধারকারী দল গ্রামে প্রবেশের অনুমতি পেলেও তাদের ওপর আবারও হামলার অভিযোগ ওঠে। ফলে তারা কেবল ফারাজকে উদ্ধার করতে সক্ষম হন। কয়েক ঘণ্টা পর পুনরায় অনুমতি মেলার পর রাতে ধ্বংসস্তূপ থেকে আমাল খলিলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
হাসপাতালের চিকিৎসকদের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, শেষ হামলার অন্তত আড়াই ঘণ্টা পর পর্যন্ত খলিল জীবিত ছিলেন বলে সম্ভাবনা রয়েছে। সে সময় তিনি ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিলেন এবং উদ্ধার বিলম্বিত হওয়ায় তার মৃত্যু ঘটে থাকতে পারে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের পরিচালক হেবা মোরায়েফ বলেন, গত কয়েক বছরে লেবাননে সাংবাদিক ও বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হামলাগুলোর যথাযথ বিচার না হওয়ায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়েছে। তার মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত অবিলম্বে ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত লেবাননে অন্তত ১৫ জন এবং গাজায় ২১০ জনের বেশি সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সংঘাতপূর্ণ এলাকায় আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার প্রশ্নে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে আমাল খলিল হত্যার এই ঘটনা।