- ০২ অক্টোবর, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। কক্সবাজার
পর্যটনের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত কক্সবাজার। দীর্ঘ বালুকাময় সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন এলাকায় একসময় ছড়িয়ে ছিল অসংখ্য পুকুর ও জলাধার। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল ও মাটি ফেলে ভরাটের কারণে ক্রমেই কমছে এসব জলাধার। এর প্রভাব পড়ছে পানি নিষ্কাশন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, স্থানীয় পরিবেশ ও সুপেয় পানির সরবরাহে।
জেলার পেকুয়া উপজেলায় সদর ৪ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদের কাছে প্রায় সাড়ে ৯ বিঘা আয়তনের একটি সরকারি পুকুরও গত কয়েক বছরে সংকুচিত হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, গত তিন বছরে পুকুরটির চারপাশের অংশ ধীরে ধীরে ভরাট হওয়ায় এর আয়তন কমেছে। অথচ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ হাজার মানুষ বিভিন্ন কাজে এই পুকুরের পানি ব্যবহার করেন। হাটবারে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২৫ থেকে ৩০ হাজারে পৌঁছায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
শুধু পেকুয়ার এই পুকুর নয়, কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় বহু পুকুর ও জলাধার দখল ও ভরাটের শিকার হয়েছে। এসব জায়গায় গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি, বহুতল ভবন, বাজার ও অন্যান্য স্থাপনা।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কক্সবাজারে পুকুর রয়েছে ৯ হাজার ৫৬০টি। এর মধ্যে চকরিয়ায় ৮৮৭, কুতুবদিয়ায় ৬৩২, কক্সবাজার সদরে ৮৮৪, রামুতে ১ হাজার ৯৮০, উখিয়ায় ৮৮০, মহেশখালীতে ১৯৯, পেকুয়ায় ৩ হাজার ৩১৭ এবং টেকনাফে ৮১৬টি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় জেলায় পুকুরের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৬৩৭টি। অর্থাৎ সরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যানে সময়ের ব্যবধানে পুকুরের সংখ্যা কমে আসার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, বাস্তবে বর্তমানে টিকে থাকা পুকুরের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও কম।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, প্রতিবছর পুকুর হারিয়ে যাওয়ার প্রবণতা জেলার জন্য উদ্বেগজনক। সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন উভয় ধরনের পুকুর ভরাটের কারণে পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি সুপেয় পানির সংকটও তীব্র হচ্ছে।
পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি এলাকার পুকুর ও জলাধার শুধু পানি সংরক্ষণের জায়গা নয়; এগুলো স্থানীয় প্রতিবেশব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার মাধ্যমে জলাধারগুলো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমায়। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, পুকুর ও জলাশয় কমে গেলে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনজীবনে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। পুকুর ভরাটের অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।
তার ভাষ্য, জলাধার বৃষ্টির পানি ধারণ করে এবং অতিরিক্ত পানির চাপ কমাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি জলাশয় কমে গিয়ে নির্মিত এলাকা বাড়তে থাকলে স্থানীয় তাপমাত্রার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
কক্সবাজারভিত্তিক পরিবেশ সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক বলেন, জলাধার কমে যাওয়ার সঙ্গে স্থানীয় ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। তার মতে, জলাধারের পানি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে আশপাশের পরিবেশকে তুলনামূলক ঠান্ডা রাখতে সহায়তা করে। বিপরীতে কংক্রিট, ইট ও পিচের মতো নির্মিত পৃষ্ঠ তাপ ধরে রাখে।
পুকুর ও জলাধার কমে যাওয়ার পাশাপাশি কক্সবাজারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও দ্রুত নিচে নামছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় সুপেয় পানির সংকট ক্রমেই বাড়ছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী আবুল মনজুর জানান, কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর প্রায় ১০ থেকে ১১ ফুট করে নিচে নামছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক দশক আগে কক্সবাজার শহরের টেকপাড়া এলাকায় প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ ফুট গভীরতায় ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া যেত। বর্তমানে সেখানে পানির জন্য ৩০০ ফুটেরও বেশি গভীরে যেতে হচ্ছে। কলাতলী এলাকাতেও গত কয়েক বছরে পানির স্তর প্রায় ১০ থেকে ১৫ ফুট নিচে নেমেছে। এতে সাগরপাড়ের কয়েকশ আবাসিক হোটেলের অনেক পানির পাম্প অকেজো হয়ে পড়েছে।
অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের পাশাপাশি পুকুর ও জলাশয় ভরাট, অনাবৃষ্টি এবং বাড়তি তাপমাত্রাকে এ সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০ অনুযায়ী পুকুর, জলাশয়, নদী ও খালসহ প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করা নিষিদ্ধ। এসব জলাধারের শ্রেণি পরিবর্তন বা অন্যভাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও আইনগত বিধিনিষেধ রয়েছে। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া জলাশয় রক্ষায় পরিবেশ সংরক্ষণসংক্রান্ত আইনেও বিধিনিষেধ রয়েছে। প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে ভরাট বন্ধ ও জরিমানা করা হলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি জলাধার ভরাটের প্রবণতা। কোথাও অভিযান শেষে ভরাট বন্ধ হলেও পরবর্তী সময়ে আবার মাটি ফেলার অভিযোগও পাওয়া যায়।
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং পৃষ্ঠপানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
সহকারী প্রকৌশলী আবুল মনজুর বলেন, কক্সবাজারে সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বাঁকখালী নদীর পানি শোধনের একটি বড় প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০ লাখ লিটার পানি শোধন করা সম্ভব হবে, যা কক্সবাজার পৌর এলাকার মোট পানির চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করতে পারবে।
এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্রকল্প চালু রয়েছে। উখিয়া ও টেকনাফে স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পানির চাহিদা মেটাতেও পৃষ্ঠপানি সংরক্ষণ ও পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজারের পানি ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় বিদ্যমান পুকুর-জলাধার রক্ষা, দখল ও ভরাট বন্ধ এবং নতুন জলাধার সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৃষ্টির পানি ও পৃষ্ঠপানির ব্যবহার বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে সংকট আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।