Saturday, July 25, 2026

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার অবমাননা চলবে না: প্রসঙ্গ বাংলা একাডেমীর হট্টগোল


ছবিঃ বাংলা একাডেমির দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি (সংগৃহীত)

লেখক: কবি ও গল্পকার আজাদুল হক আজাদ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে অনিবার্য ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়। যারা এই আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন কিংবা গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন; তাদের স্মৃতি ও আত্মত্যাগ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের খেয়ালখুশির বিষয় হতে পারে না।

বাংলা একাডেমি কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা মতাদর্শের রাজনৈতিক পরীক্ষাগার নয়। এটি জাতির সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। অথচ গভীর উদ্বেগের সঙ্গে আমরা লক্ষ্য করছি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এমন কিছু ঘটনা ও বক্তব্য সামনে এসেছে, যা গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং জনগণের আবেগকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কবিতা পাঠ’ অনুষ্ঠানকে ঘিরে এমন কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য সামনে এসেছে, যা দেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হওয়া উচিত সব ধরনের আয়োজনকে এমনভাবে পরিচালনা করা, যাতে শহীদদের স্মৃতি, অংশগ্রহণকারীদের অনুভূতি এবং জনমানুষের আবেগ তথা দেশের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান বজায় থাকে।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পূর্ব থেকেই অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পরিসরকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে বিতর্কিত বা খাটো করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনে প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

একইভাবে, বাংলা একাডেমী থেকে সুবিধাপ্রাপ্ত বিতর্কিত কবি মোহন রায়হানের অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্য ও কবিতাপাঠ নিয়েও তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যদি তাঁর বক্তব্য বা কবিতা সত্যিই জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে অবমাননা করে থাকে, আন্দোলনকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে থাকে অথবা শহীদদের আত্মত্যাগকে প্রশ্নবিদ্ধ করে থাকে, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই স্বাধীনতার আড়ালে জাতির গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন বা শহীদদের মর্যাদাকে আঘাত বা বিগত পলাতক ফ্যাসিবাদী শক্তির পক্ষে বয়ান তৈরি করার অধিকার কারও নেই।

আমরা আরও মনে করি, জাতীয় সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আয়োজনকে অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত না করে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার মর্যাদা রক্ষা করা উচিত। আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি নিয়েও যদি আয়োজকদের সমন্বয়হীনতা প্রকাশ পেয়ে থাকে, তবে সেটিও পর্যালোচনার দাবি রাখে।

আমাদের দাবি—

১. বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও বিতর্কিত বক্তব্যের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।

২. যদি প্রমাণিত হয় যে কোনো কর্মকর্তা বা অংশগ্রহণকারী ইচ্ছাকৃতভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও শহীদদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে যথাযথ সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩. বাংলা একাডেমিকে জাতীয় ঐক্য, মুক্তচিন্তা ও ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধ সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।

৪. ভবিষ্যতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান বা জাতীয় ইতিহাসভিত্তিক যেকোনো সাংস্কৃতিক আয়োজনে শহীদদের সম্মান, ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতা এবং পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তির একক সম্পত্তি নয়; কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা, ত্যাগ ও সংগ্রামের প্রতীক। সেই ইতিহাসকে খাটো করার কিংবা বিতর্কের আড়ালে তার মর্যাদা নষ্ট করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আমরা গণতান্ত্রিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে সোচ্চার থাকব।

আমরা সতর্ক করে দিতে চাই—জাতির আত্মত্যাগের ইতিহাস নিয়ে কোনো ধরনের অবমাননা বা যেকোন বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা জনগণ নীরবে মেনে নেবে না। বাংলা একাডেমির মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে দ্রুত, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন