Sunday, April 19, 2026

গাজায় ধ্বংসের মাঝেই ‘বোর্ড অব পিস’: শান্তি নাকি সময়ক্ষেপণের কৌশল


ফাইল ছবিঃ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় ইশারা করছেন। (সংগৃহীত । আল জাজিরা । নাথান হাওয়ার্ড/, রয়টার্সের মাধ্যমে)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

দুই বছরের বেশি সময় ধরে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চলার পরও সেখানে শান্তির কোনো দৃশ্যমান পথ তৈরি হয়নি। ব্যাপক হামলায় উপত্যকার বেশির ভাগ ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে, প্রাণ হারিয়েছেন লক্ষাধিকের কাছাকাছি ফিলিস্তিনি, আর জীবিত মানুষেরা এখন তীব্র শীত, খাদ্য ও চিকিৎসা সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে গঠিত তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ ঘিরে। গাজা পুনর্গঠন ও শাসনব্যবস্থা তদারকির লক্ষ্যে গঠিত এই বোর্ডে যুক্ত হয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু—যাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।

এই অংশগ্রহণ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—ইসরায়েল কি সত্যিই গাজাকে পুনর্গঠন করতে চায়, নাকি বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী করাই তাদের লক্ষ্য?

বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর সামনে পরিস্থিতি জটিল। সামনে ইসরায়েলে নির্বাচন থাকায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হচ্ছে। আবার দেশের ভেতরে তাঁর জোট সরকার টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে এমন রাজনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভর করে, যারা গাজায় যুদ্ধবিরতি কিংবা পুনর্গঠনের ঘোর বিরোধী।

বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গাজা পরিকল্পনাকে ‘ইসরায়েলের জন্য ক্ষতিকর’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এমনকি যুদ্ধবিরতি তদারকিতে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত একটি সামরিক স্থাপনা বন্ধের দাবিও তুলেছেন তিনি।

নেতানিয়াহু চাইলেও যুক্তরাষ্ট্রের তিন ধাপের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ পিছিয়ে দিতে পারেননি। হামাসের নিরস্ত্রীকরণ না হলেও যুদ্ধবিরতির পরবর্তী পর্যায় এগোচ্ছে। একই সঙ্গে রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং খুলে দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে, যা ইসরায়েলের আপত্তি সত্ত্বেও বাস্তবায়নের পথে।

এ ছাড়া তুরস্ক ও কাতারকে বোর্ড অব পিসে অন্তর্ভুক্ত করা এবং সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের বিষয়েও ওয়াশিংটন ইসরায়েলের আপত্তি উপেক্ষা করেছে।

ইসরায়েলের ভেতরে গাজা ইস্যুতে রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট। একাংশ গাজায় বসতি স্থাপনের পক্ষে থাকলেও বড় একটি অংশ শুধু নিরাপত্তা চায়। দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তি সাধারণ মানুষের মধ্যে যুদ্ধবিরতির প্রতি এক ধরনের অনিচ্ছুক সমর্থন তৈরি করেছে।

ইসরায়েলি-আমেরিকান রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডালিয়া শেইন্ডলিন বলেন, অধিকাংশ ইসরায়েলি এখন আর যুদ্ধে ফিরতে চান না। তবে একই সঙ্গে তারা গাজা নিয়ে বাইরের শক্তির ওপর আস্থাও রাখতে পারছেন না।

ইসরায়েলের সংসদ সদস্য ওফার কাসিফ অভিযোগ করেছেন, সরাসরি বোমাবর্ষণ কমলেও গাজায় মানবিক অবরোধের মাধ্যমে মৃত্যুকে অব্যাহত রাখা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “এটি সক্রিয় হামলা থেকে নিষ্ক্রিয় ধ্বংসে রূপ নিয়েছে—এবং এটি রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ।”

অনেক ইসরায়েলি বিশ্লেষক মনে করেন, সরকার দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শির হেভারের মতে, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সামরিক পদক্ষেপগুলোর পেছনে কৌশলের চেয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট বেশি কাজ করেছে।

গাজা যুদ্ধবিরতি, পুনর্গঠন ও ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা—সবকিছু নিয়েই অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কেউ কেউ আশা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান ইসরায়েলকে কিছু সিদ্ধান্তে বাধ্য করতে পারে। আবার অনেকে মনে করেন, এই ‘বোর্ড অব পিস’ বাস্তবে সময়ক্ষেপণের একটি রাজনৈতিক কৌশল ছাড়া কিছুই নয়।

একজন শান্তি আন্দোলনকর্মীর কথায়, “গাজায় মানুষ মরছে, আর আমরা বোর্ড, পরিকল্পনা আর বৈঠকের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি। ইতিহাস হয়তো এর বিচার করবে।” তথ্যসূত্রঃ আল জাজিরা

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন