Saturday, September 26, 2026

এস আলমের নিয়ন্ত্রণে ইসলামী ব্যাংকে পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ ৮ হাজার ৫৪২ জন


প্রতীকী ছবিঃ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে ১০ হাজার ৮৩২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা লিখিত-মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই শুধু জীবনবৃত্তান্তের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকটির নিয়োগ কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বাসিন্দা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি তৈরি করতে চলতি বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফুজ্জামানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ ও পরবর্তী সময়ে কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল কি না, তা যাচাই করতে এই কমিটি কাজ করে। ছাঁটাই হওয়া কর্মী এবং ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতেও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে কোনো সুপারিশ না করে সংশ্লিষ্ট সময়ের নিয়োগ ও ছাঁটাইয়ের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকে মোট কর্মী ছিলেন ২১ হাজার ৫৫১ জন। এর মধ্যে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া হয় ১০ হাজার ৮৩২ জনকে।

এই সময়ে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ কিংবা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ৮ হাজার ৯৯ জনই চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা। আবার চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন ৫ হাজার ১৪৮ জন।

ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো পদে নিয়োগের আগে যোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করে অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার কথা। এরপর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচন করার নিয়ম রয়েছে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বর পাওয়াকে যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়।

কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে ওই নীতিমালা অনুসরণ না করে ২৭টি পদে নিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) পদে ২ হাজার ৭৮৯ জন এবং ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার পদে ২ হাজার ১৬০ জনকে পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া মেসেঞ্জার কাম গার্ড পদে ১ হাজার ৫৪৪ জন এবং রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিমের (আরডিএস) স্টাফ হিসেবে ৯১৫ জন নিয়োগ পান। একই সময়ে ৫০১ জন ট্রেইনি জুনিয়র অফিসারও নিয়োগ দেওয়া হয়।

শুধু নিম্ন ও মধ্যম পর্যায়ের পদ নয়, ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের কয়েকটি পদেও বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময়ে দুইজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), আটজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি), দুইজন সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসইভিপি) এবং ব্যাংকের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের জন্য একজন প্রিন্সিপাল নিয়োগ দেওয়া হয়। পাঁচজন এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্টের (ইভিপি) মধ্যে চারজনকে নিয়োগ দেওয়া হয় কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী, ডিএমডি পদে নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা এবং আগের পদে কমপক্ষে দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকা প্রয়োজন।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই শর্ত পূরণ না করেই এস আলমের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচিত আকিজ উদ্দিনকে আট বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা থাকা অবস্থায় ডিএমডি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। একইভাবে মিফতাহ উদ্দীনকে ১৭ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা অবস্থায় ডিএমডি করা হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশদ পরিদর্শন এবং চারটি বহির্নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ নিরীক্ষায় ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অনিয়মের বিষয় উঠে আসে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ।

তবে পরীক্ষা বন্ধের দাবিতে ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট দুই কর্মী হাইকোর্টে রিট করেন। পরে ২৭ আগস্ট আদালত বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেন। ২৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, যোগ্যতা যাচাইয়ের পরীক্ষা নিতে কোনো বাধা নেই।

এরপর ২৭ সেপ্টেম্বর ইসলামী ব্যাংক মূল্যায়ন পরীক্ষার আয়োজন করে। প্রাথমিকভাবে এতে ৫ হাজার ৩৭৩ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে ৪০২ জন পরীক্ষায় অংশ নেন এবং তারা সবাই চাকরিতে বহাল রয়েছেন। বাকি ৪ হাজার ৯৭১ জন পরীক্ষায় অংশ নেননি।

পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা আরও ২৮৭ জনকে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ৪ হাজার ৬৮৫ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়।

বরখাস্ত হওয়া কর্মীদের মধ্যে ৪ হাজার ৪৪০ জনের বাড়ি চট্টগ্রামে। এ ছাড়া কক্সবাজারের ১৫৫ জন, ঢাকার ১০ জন এবং দেশের অন্যান্য ৬১ জেলার ৮০ জন কর্মী ছিলেন।

এর বাইরে পাঁচজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে ১২১ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নবায়ন না করায় চাকরি হারিয়েছেন ১ হাজার ১৯০ জন। অন্যান্য কারণে আরও ১৩৬ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে এসব নিয়োগ ও পরবর্তী কর্মী ছাঁটাইয়ের তথ্য নথিভুক্ত করা হলেও এ বিষয়ে কোনো সুপারিশ করা হয়নি। প্রতিবেদনের তথ্য এখন পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় রয়েছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন