- ৩০ অক্টোবর, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
দেশের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে সরবরাহ সংকট ও বাড়তি দামের অভিযোগের মধ্যেই সিলিন্ডারের দাম আরও বাড়ানোর প্রস্তাব সামনে এসেছে। আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা করার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশনে এলপিজির মূল্য ও বিক্রয় কমিশন পুনর্নির্ধারণ নিয়ে আয়োজিত গণশুনানিতে এ সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
শুনানিতে বেসরকারি এলপিজি সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে অপারেটর, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর দাবি ও ব্যয়ের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে কারিগরি কমিটি কয়েকটি খাতে নতুন মূল্য নির্ধারণের সুপারিশ করেছে।
বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির হিসাব অনুযায়ী, এলপিজির আমদানি পর্যায়ে ইমপোর্ট প্যারিটি প্রাইস বর্তমানে প্রতি কেজি ১২৮ টাকা ৪০ পয়সা। নতুন প্রস্তাবে এ মূল্য ১১৭ টাকা ১২ পয়সা থেকে ১২৯ টাকা ৫০ পয়সার মধ্যে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। কমিটি প্রতি কেজি ১২৮ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে।
এ ছাড়া মজুতকরণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাবও পর্যালোচনা করেছে কমিটি। বর্তমানে এ খাতে প্রতি কেজিতে ১৬ টাকা ৭৪ পয়সা নেওয়া হয়। কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব ছিল ২৭ টাকা ৬২ পয়সা থেকে ৩৬ টাকা ৯২ পয়সা পর্যন্ত। তবে কারিগরি কমিটি প্রতি কেজিতে ২৩ টাকা ৪৮ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে অপারেটরের প্ল্যান্ট থেকে পরিবেশকের কাছে পরিবহন ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পরিবেশক পর্যায়ে বর্তমানে প্রতি কেজি এলপিজিতে চার্জ রয়েছে ৪ টাকা ১৭ পয়সা। কোম্পানিগুলো তা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৪ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৫০ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছিল। কারিগরি কমিটি এ খাতে প্রতি কেজিতে ৬ টাকা ৬৭ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে।
অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ বর্তমানে প্রতি কেজিতে ৩ টাকা ৭৫ পয়সা। এ হার বাড়িয়ে ৫ টাকা ৮৩ পয়সা থেকে ৭ টাকা ৫০ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। মূল্যায়ন কমিটি সর্বনিম্ন প্রস্তাবিত হার, অর্থাৎ ৫ টাকা ৮৩ পয়সা নির্ধারণের পক্ষে মত দিয়েছে।
সব পর্যায়ের ব্যয় ও কমিশন হিসাব করে খুচরা বিক্রেতার পর্যায়ে প্রতি কেজি এলপিজির দাম বর্তমানে ১৫৩ টাকা ৬০ পয়সা। কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব ছিল ১৫৮ টাকা ৯১ পয়সা থেকে ১৮৫ টাকা ৯৭ পয়সা। তবে কারিগরি কমিটি প্রতি কেজির দাম ১৬৪ টাকা ৬৮ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে।
এসব হিসাবের ভিত্তিতেই ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা করার প্রস্তাব এসেছে।
গণশুনানিতে এলপিজির দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ভোক্তাদের স্বার্থকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভোক্তা অধিকারকর্মী ও সাংবাদিকেরা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বলেন, এলপিজির দাম বাড়ানো বা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করা বিইআরসির দায়িত্ব। ভোক্তাদের স্বার্থ উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে এ ধরনের গণশুনানির যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।
সিনিয়র সাংবাদিক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যবসায়ীদের দাবির ভিত্তিতে বারবার দাম বাড়ানো হলে বিইআরসির প্রতি গ্রাহকদের আস্থা কমে যাবে। ভোক্তারা কেন ন্যায্য দামে এলপিজি পাচ্ছেন না, কমিশনকে সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাজারে অতিরিক্ত দাম আদায় ও কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে কমিশনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বিইআরসির নিয়ম অনুযায়ী, গণশুনানির পর প্রাপ্ত সুপারিশ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত পর্যালোচনা করে মূল্য নির্ধারণের কথা রয়েছে। শুনানির ৯০ দিনের মধ্যে নতুন দাম ঘোষণার কথা জানিয়েছে কমিশন। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, আগামী সপ্তাহেই নতুন মূল্য ঘোষণা করা হতে পারে।
এদিকে বাজারে এলপিজির সরবরাহ সংকট ও অতিরিক্ত দামের অভিযোগের কারণে আগে থেকেই ভোগান্তিতে রয়েছেন সাধারণ গ্রাহকেরা। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে দাম বাড়ানোর সুপারিশ কার্যকর হলে তাঁদের ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
তাই শুধু পরিবেশক ও বিক্রেতাদের কমিশন পুনর্নির্ধারণ নয়, বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, কৃত্রিম সংকট ঠেকানো এবং নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করাও এখন বিইআরসির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।