- ২৮ অক্টোবর, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি এবং বেসরকারি খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে গত পাঁচ মাসে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। শেয়ারনির্ভর পুঁজিবাজারকে আরও বহুমুখী করতে এবং করপোরেট বন্ডের লেনদেন বাড়াতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুমোদিত বন্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকের ১ হাজার কোটি টাকার তিন বছর মেয়াদি জিরো-কুপন গ্রিন বন্ড, সাউথইস্ট ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড, ব্যাংক এশিয়ার ৮০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাসটেইনেবল সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড এবং ওয়ান ব্যাংকের ৪০০ কোটি টাকার সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড।
বিএসইসির বর্তমান নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব বন্ড অনুমোদনের পাশাপাশি বাজারের কাঠামোগত উন্নয়নেও বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে করপোরেট বন্ডকে স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত করা, সামাজিক ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক বন্ড চালু, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং বন্ড ইস্যুর বিধিমালা আধুনিক করা।
সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অনুমোদিত বন্ডগুলো স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত করার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এসব বন্ডের দ্বিতীয় বাজারে লেনদেনের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছে কমিশন। পাশাপাশি বন্ডের তালিকাভুক্তি ফি কমানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, বন্ড মার্কেটকে গতিশীল করতে এবারই প্রথম মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তির শর্ত দেওয়া হয়েছে। এতে স্টক এক্সচেঞ্জের দ্বিতীয় বাজারে বন্ড কেনাবেচার সুযোগ বাড়বে। এ লক্ষ্যেই তালিকাভুক্তি ফি কমানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তি হলে বিনিয়োগকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী বন্ড বিক্রি করে বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন। এতে বন্ডের লেনদেন বাড়ার পাশাপাশি কার্যকর দ্বিতীয় বাজার গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
পুঁজিবাজারে নতুন ধরনের বিনিয়োগ পণ্য যুক্ত করার অংশ হিসেবে পরিবেশ সুরক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন ও নারী ক্ষমতায়নের মতো লক্ষ্যভিত্তিক বন্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। এরই মধ্যে নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের জন্য সাজেদা ফাউন্ডেশনের ১৫৮ কোটি টাকার ‘অরেঞ্জ বন্ড’ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রিন বন্ড পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগে অর্থায়নের পাশাপাশি টিয়ার-২ মূলধন সংগ্রহে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বন্ডের মাধ্যমে প্রচলিত বিনিয়োগ পণ্যের বাইরে নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে কমিশন।
করপোরেট বন্ড বাজারে বড় প্রাতিষ্ঠানিক তহবিলের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে বিএসইসি। কমিশনের মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন প্রভিডেন্ট ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডের অর্থের বড় অংশ সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়। এসব তহবিলের একটি নির্দিষ্ট অংশ যাতে করপোরেট বন্ড ও শেয়ারে বিনিয়োগ করা যায়, সে লক্ষ্যে নতুন নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে।
এ উদ্যোগ কার্যকর হলে পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি অর্থের জোগান বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ব্যাংকঋণের বাইরে বিকল্প অর্থায়নের সুযোগও সম্প্রসারিত হবে।
বন্ড বাজারে বীমা কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ভিত্তিক মিউচুয়াল ফান্ড এবং বীমা কোম্পানির তহবিল যাতে করপোরেট বন্ডে বেশি বিনিয়োগ করতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া বন্ড কেনাবেচার জন্য পৃথক লেনদেন প্ল্যাটফর্ম আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। এতে বিনিয়োগকারীদের বন্ড কেনাবেচা সহজ হবে এবং দ্বিতীয় বাজারে লেনদেন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বন্ড অনুমোদন ও ইস্যুর প্রক্রিয়া সহজ করতে বিদ্যমান আইনি কাঠামো আধুনিক করার কাজও চলছে। এ লক্ষ্যে ডেট ইস্যু রুলস সংশোধন ও সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। নতুন বিধিমালায় অনুমোদন ও ইস্যুপ্রক্রিয়া আরও কার্যকর করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কমিশনের লক্ষ্য, পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ার কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শেয়ার, বন্ড ও অন্যান্য আর্থিক পণ্যের সমন্বয়ে একটি বহুমুখী বাজার হিসেবে গড়ে তোলা।
সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও বিকল্প তৈরি হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে বন্ডের নিয়মিত লেনদেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ এবং কার্যকর দ্বিতীয় বাজার গড়ে তোলার অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।