Tuesday, October 6, 2026

এলপিজি সংকট নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন, কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ


ছবিঃ গ্যাস (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা 

দেশের বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহ সংকট এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কয়েকটি এলপিজি কোম্পানি বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি মুনাফা নেওয়ার চেষ্টা করছে এমন তথ্য উঠে এসেছে দুটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে। বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে জানানো হলে শনিবার এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোটাব) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে এলপিজির মজুত, আমদানি ও বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য তুলে ধরে বৈঠকে বলা হয়, দেশে চাহিদার তুলনায় এলপিজি আমদানিতে ঘাটতির স্পষ্ট প্রমাণ নেই। তাহলে বাজারে সংকট তৈরি হলো কীভাবে এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে কেন এমন প্রশ্ন তোলা হয় অপারেটরদের কাছে।

তবে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন লোটাবের নেতারা। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম এবং আমদানি ব্যয় বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দাম কিছুটা সমন্বয় করা হলে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে সুবিধা হবে।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে পড়লেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি জ্বালানি মন্ত্রী।

ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বরের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজির সরবরাহে টান দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা হলেও কোথাও কোথাও তা ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। তবে এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো অপারেটর আগেভাগে এলপিজি মজুত করেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকটি কোম্পানি তাদের নিজস্ব ট্যাংকারে আগে থেকেই এলপিজি মজুত করে রেখেছে। এমনকি ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি এলাকায় কিছু এলপিজিবাহী জাহাজ অবস্থান করছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কোম্পানি।

মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, তাদের ফ্রেশ এলপিজি কোনো মজুত করেনি। বরং সেপ্টেম্বরে আগের তুলনায় কম পরিমাণ এলপিজি আমদানি করা হয়েছে এবং এর তথ্য এনবিআরের নথিতেও রয়েছে। সংকট কাটাতে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে আরও বেশি এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ওমেরা পেট্রোলিয়ামের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরীও মজুতের অভিযোগ নাকচ করেছেন। তার ভাষ্য, ওমেরাসহ কয়েকটি কোম্পানির বিরুদ্ধে এলপিজি মজুতের যে খবর এসেছে, তা সঠিক নয়। বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমেই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে দেড় লাখ টনের বেশি এলপিজি ব্যবহৃত হয়। মোট চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে আমদানি করা হয়। দেশে প্রায় ২৯টি এলপিজি কোম্পানি সক্রিয় থাকলেও বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে ১২ থেকে ১৪টি প্রতিষ্ঠান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারের প্রায় ৬৮ শতাংশ এলপিজি সরবরাহ করে চারটি কোম্পানি ওমেরা পেট্রোলিয়াম, পেট্রোমেক্স, মেঘনা ও যমুনা স্পেসটেক। এ ছাড়া বিএম এনার্জি প্রায় ৮ শতাংশ, ইউনাইটেড আইগ্যাজ ৭ শতাংশ এবং ডেল্টা প্রায় ৪ শতাংশ সরবরাহ করে। জেএমআই ও প্রিমিয়াম এলপিজির অংশ প্রায় ৩ শতাংশ করে।

আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে আমদানির পরিমাণও প্রায় একই ছিল বলে বিইআরসির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

সেপ্টেম্বরে ইউনাইটেড আইগ্যাজ প্রায় ২৩ হাজার ৫০০ টন এলপিজি আমদানি করেছে, যা আগস্টের প্রায় ১২ হাজার টনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। যমুনা স্পেসটেক প্রায় ২১ হাজার টন, বিএম এনার্জি ১৮ হাজার ২৫২ টন, ওমেরা প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ টন এবং মেঘনা গ্রুপ প্রায় ১৩ হাজার ৪০০ টন এলপিজি আমদানি করেছে।

বাজারে সংকটের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে এলপিজি বিক্রির তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে বিইআরসি। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ১০ থেকে ১২টি কোম্পানির কাছে সেপ্টেম্বর মাসের প্রতিদিনের এলপিজি বিক্রির হিসাব চাওয়া হয়েছে।

কমিশনের সচিব নজরুল ইসলাম সরকারের সই করা চিঠিতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে সেপ্টেম্বরের দৈনিক বিক্রির তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে। রোববারের মধ্যে এসব তথ্য কমিশনে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে পারে দেশের বাজারেও। সেপ্টেম্বর মাসে এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি টনে প্রায় ১৮০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত প্রিমিয়াম খরচ হয়েছে বলে জ্বালানি বিভাগ ও বিইআরসির সংগ্রহ করা আমদানি নথিতে দেখা গেছে।

এর পাশাপাশি সৌদি আরামকোর ঘোষিত কন্ট্রাক্ট প্রাইসও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য নির্ধারণে এই দাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এসব তথ্য ও আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তন পর্যালোচনা করে অক্টোবর মাসের জন্য এলপিজির নতুন দাম নির্ধারণ করছে বিইআরসি। নিয়ম অনুযায়ী, রোববার বিকেলে নতুন মূল্য ঘোষণা করার কথা রয়েছে।

তবে নতুন দাম নির্ধারণের পাশাপাশি বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রি বন্ধ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন