Saturday, January 10, 2026

দ্রুতগতির সিনেমার যুগে ধৈর্য ও মন্থরতার প্রতীক ছিলেন বেলা তার


ছবিঃ বেলা তারের সঙ্গে প্রসূন রহমান (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

কিছু মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিকল্পনা করে হয় না, সময় নিজেই সে আয়োজন করে। কিংবদন্তি হাঙ্গেরীয় চলচ্চিত্রকার বেলা তারের সঙ্গে আমার দেখা তেমনই এক স্মৃতির অংশ হয়ে আছে। ২০২২ সালে ২৭তম কেরালা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (আইএফএফকে) তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ হয়েছিল—যা আজ তাঁর প্রয়াণের পর আরও গভীর তাৎপর্য বহন করছে।

সেবার আমাদের চলচ্চিত্র ‘প্রিয় সত্যজিৎ’ উৎসবে আমন্ত্রিত হয়েছিল। প্রতিযোগিতা বিভাগে না থাকলেও আমন্ত্রণ গ্রহণের প্রধান কারণ ছিলেন বেলা তার। আজীবন সম্মাননা গ্রহণ করতে তিনি কেরালায় আসছিলেন। ১২ ও ১৪ ডিসেম্বর আমাদের ছবি প্রদর্শিত হয়, আর ১৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় তাঁর সম্মানে বিশেষ নৈশভোজ।

নৈশভোজের আসরে মাঝখানের একটি টেবিলে বসেছিলেন বেলা তার। বয়সের ভারে কিছুটা ক্লান্ত, কিন্তু ব্যক্তিত্বে অনড়। পাশে তাঁর সঙ্গিনী—নিরিবিলি, শান্ত ও সদাহাস্য। চারপাশে এক ধরনের নীরব সম্মানময় আবহ, যেন তাঁর সিনেমার দীর্ঘ শটের মতোই সময় সেখানে ধীরে প্রবাহিত হচ্ছিল। অনেকে শ্রদ্ধায় দূরত্ব বজায় রাখছিলেন।

কিন্তু পরিচয় দিতেই সেই দূরত্ব মিলিয়ে গেল। তিনি হাত বাড়ালেন, পাশে বসতে বললেন, স্বাভাবিক হাসিতে কথা শুরু করলেন। কোনো কিংবদন্তির ভঙ্গি ছিল না। জানতে চাইলেন বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নিয়ে, আমাদের ছবি নিয়ে। তাঁর কৌতূহল ছিল অকৃত্রিম ও আন্তরিক। আমরা কথা বললাম সিনেমা, জীবন, পছন্দের পানীয়, আর কোন ধরনের চলচ্চিত্র এখনো তাঁকে ভাবায়—এসব নিয়ে।

তিনি কথা বলছিলেন এমন একজন মানুষের মতো, যাঁর আর কিছু প্রমাণ করার নেই। গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন, যেন প্রতিটি মানুষই তাঁর কাছে একেকটি আলাদা গল্প।

পরদিন তিরুবনন্তপুরমের একটি মিলনায়তনে উপচে পড়া দর্শকের সামনে প্রায় দুই ঘণ্টা কথা বলেন বেলা তার। তাঁর কণ্ঠ ছিল সিনেমার মতোই সংযত ও নির্ভার। শৈশব, কর্মজীবন, চলচ্চিত্রে আসার অনিবার্য পথ—সবকিছুই উঠে আসে তাঁর কথায়। তিনি ব্যাখ্যা করেন দীর্ঘ শটের দর্শন, সময়কে কৌশল নয় বরং নৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখার দর্শন। দর্শকদের প্রশ্নের উত্তরে ছিল তীক্ষ্ণ রসবোধ ও দৃঢ় আত্মবিশ্বাস।

একসময় নিজের সিদ্ধান্তেই সিনেমা বানানো বন্ধ করেন তিনি। প্রযোজকের অভাবে নয়, বরং মনে করেছিলেন—যা বলার, তা বলা হয়ে গেছে। কেউ কেউ শব্দে নয়, নীরবতায় অবসর নেন। বেলা তার নীরবতাকেই বেছে নিয়েছিলেন। দ্রুতগতির আধুনিক সিনেমার বিপরীতে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন ধৈর্য, মন্থরতা ও পর্যবেক্ষণের পক্ষে।

সেই নৈশভোজের টেবিল ও পরদিনের মিলনায়তনে বসে মনে হয়েছিল—আমি শুধু একজন চলচ্চিত্রকারকে সম্মানিত হতে দেখছি না, দেখছি একটি দর্শনকে, একটি বিশ্বাসকে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে।

বেলা তার আজ আর নেই। তবে যে নীরবতার ওপর তিনি বিশ্বাস রেখেছিলেন, সেই নীরবতা এখনো আমাদের চারপাশে রয়ে গেছে। তাঁর চলচ্চিত্র ও দর্শনের মতোই সেই নীরবতা আমাদের সঙ্গী হয়ে থাকবে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন