Tuesday, June 30, 2026

চীনা পণ্যের ঢলে উদ্বিগ্ন ইউরোপ, বাণিজ্য ভারসাম্য ফেরাতে কঠোর অবস্থানে ইইউ


ছবিঃ এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাও (বামে) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য কমিশনার মারোস সেফকোভিচ বক্তব্য রাখছেন (সংগৃহীত । আল জাজিরা / পেদ্রো পার্দো ও অ্যানাবেল গর্ডন/এএফপি)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

চীনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য বৈষম্য এবং ইউরোপীয় শিল্পখাতের ওপর বাড়তে থাকা চাপ মোকাবিলায় আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ব্রাসেলসে সোমবার অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ইইউর বাণিজ্য কমিশনার মারোশ শেফচোভিচ স্পষ্ট ভাষায় জানান, বর্তমান বাণিজ্য পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় এবং এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি।

চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাওয়ের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শেফচোভিচ বলেন, ইউরোপীয় বাজারে চীনা পণ্যের প্রবেশ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, অথচ চীনের বাজারে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর অংশীদারিত্ব কমে যাচ্ছে। এমন একতরফা বাণিজ্যিক প্রবণতা আর মেনে নেওয়া সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক বছর আগেও বৈশ্বিক মুক্তবাণিজ্যের অন্যতম প্রবল সমর্থক ছিল ইউরোপ। কিন্তু চীনা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত সম্প্রসারণ, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি এবং কম উৎপাদন ব্যয়ের কারণে ইউরোপের নিজস্ব শিল্পখাত এখন তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। ফলে ব্রাসেলসের নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষায় নতুন কৌশল গ্রহণে বাধ্য হচ্ছেন।

ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনের সঙ্গে ইইউর বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে প্রায় ৩৬০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক বিলিয়ন ইউরো সমপরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতির মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপ।

বর্তমানে সৌর প্যানেল, বিরল খনিজ, রাসায়নিক পণ্য, শিল্প রোবট এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনসহ বিভিন্ন কৌশলগত খাতে ইউরোপীয় বাজারে চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে চীনের বিভিন্ন ব্র্যান্ড ইউরোপীয় নির্মাতাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চ শুল্ক আরোপের পরও চীনা কোম্পানিগুলোর বাজার সম্প্রসারণ থামানো যায়নি।

এই প্রতিযোগিতার প্রভাব ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও পড়েছে। ব্যয় সংকোচন ও পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে কয়েকটি বড় কোম্পানি কর্মী ছাঁটাই, স্বেচ্ছা অবসর এবং অন্যান্য আর্থিক সাশ্রয়মূলক পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বেশ কয়েকটি নতুন নীতিমালা বিবেচনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে চীনা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ সীমিত করা, সরকারি ক্রয়ে ইউরোপে উৎপাদিত পণ্যের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা এবং সংবেদনশীল শিল্পে সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও বহুমুখী করা। পাশাপাশি আগামী ১ জুলাই থেকে ইস্পাত আমদানি ও ক্ষুদ্র পার্সেলের ওপর নতুন শুল্ক ও কাস্টমস চার্জ কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

অন্যদিকে চীন বরাবরের মতো অতিরিক্ত উৎপাদনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য ঢেলে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বেইজিং সতর্ক করে জানিয়েছে, ইউরোপ যদি একতরফাভাবে কঠোর বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে প্রয়োজনীয় পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণে তারা প্রস্তুত রয়েছে।

তবে উভয় পক্ষই প্রকাশ্যে সংঘাত এড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বৈঠক শেষে শেফচোভিচ ও ওয়াং ওয়েনতাও জানান, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ভারসাম্য, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং পারস্পরিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যৌথভাবে কাজ করতে তারা সম্মত হয়েছেন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে একটি যৌথ বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ এখন একদিকে নিজস্ব শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে চাইছে, অন্যদিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যযুদ্ধও এড়াতে চায়। তাই আগামী মাসগুলোতে ব্রাসেলস ও বেইজিংয়ের আলোচনার অগ্রগতি বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন