- ১৭ আগস্ট, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর হাতে জমছে অতিরিক্ত তারল্য। সেই অর্থের একটি বড় অংশ এখন সরকারি ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করছেন ব্যাংকাররা। এতে চাহিদা বাড়ায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে ট্রেজারি বিলের সুদহার ২১ থেকে ২৫ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার আগের সপ্তাহের ৯ দশমিক ১৯ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমেছে। দীর্ঘ সময় পর এই বিলের সুদহার আবার ৯ শতাংশের নিচে নেমে এল।
একই সময়ে ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে কমে ৯ দশমিক ০৭ শতাংশ হয়েছে। আর ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের সুদহার ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে।
ব্যাংকারদের মতে, ট্রেজারি বিলের সুদহার কমার পেছনে মূলত ব্যাংকিং খাতে বাড়তি তারল্য এবং বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়াই প্রধান কারণ। বিশেষ করে দেশের বড় ব্যাংকগুলোর হাতে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উদ্বৃত্ত অর্থ রয়েছে। গত এক বছরে মে পর্যন্ত এসব ব্যাংকের আমানতে প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
অন্যদিকে আমানতের সুদহার তুলনামূলক বেশি থাকায় ব্যাংকগুলোতে নতুন আমানতও বেড়েছে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত গ্রাহকদের কাছে ব্যাংক আমানতের সুদহার আকর্ষণীয় ছিল। ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে বিনিয়োগযোগ্য অর্থের পরিমাণও বেড়েছে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম নিরাপদ ক্ষেত্র হিসেবে ট্রেজারি বিলের চাহিদাও তাই বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব বিল থেকে ৯ শতাংশের বেশি মুনাফা পাওয়ার সুযোগ থাকায় অতিরিক্ত অর্থ থাকা বেশ কয়েকটি বড় ব্যাংক সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। চাহিদা বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে সুদহারে।
এদিকে ব্যাংকগুলোতে আমানতের প্রবৃদ্ধি বাড়ায় আগস্ট থেকে অনেক শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক আমানতের সুদহার ৫০ থেকে ১০০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত কমিয়েছে। ব্যাংকাররা মনে করছেন, তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আমানত ও ট্রেজারি বিলের সুদহারে আরও কিছুটা সমন্বয় দেখা যেতে পারে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৯৫ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এই বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, ট্রেজারি বিল ও বন্ডে প্রধানত ব্যাংক, বিমা কোম্পানি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ করে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর একটি অংশ তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি সিকিউরিটিজকে বেছে নিচ্ছে।
এর আগে ২০২৩ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের ৯ শতাংশ সুদসীমা প্রত্যাহার করে স্মার্টভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা চালু করেছিল। এরপর থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা একপর্যায়ে ১২ শতাংশেরও বেশি হয়ে যায়।
ওই সময়ে ব্যাংকভেদে আমানতের সুদহারও ৯ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে ছিল। ফলে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের আকর্ষণ বেড়ে যায়। তবে বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে বাড়তি তারল্য এবং ঋণের দুর্বল চাহিদার কারণে সেই সুদহার আবার নিম্নমুখী হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, ট্রেজারি বিলের সুদহার কমে যাওয়া একদিকে ব্যাংকিং খাতে তারল্য পরিস্থিতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা কতটা দুর্বল রয়েছে, সেটিও সামনে আনছে।