- ২৬ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
গাজায় চলমান যুদ্ধ শুধু অসংখ্য মানুষের জীবনই বদলে দেয়নি, ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে সংবাদকর্মীদের জীবনেও। যুদ্ধক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আহত হওয়া বহু ফিলিস্তিনি সাংবাদিক এখন গুরুতর শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে তাঁদের অনেকেই বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছেন।
এমনই একজন ফটোসাংবাদিক মোহাম্মদ আল-কাহুজি। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ গাজায় একটি সংবাদ সংগ্রহ অভিযানের সময় বিমান হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। ওই হামলায় তাঁর দুই সহকর্মী নিহত হলেও তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। তবে সেই ঘটনার ক্ষত আজও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
আল-কাহুজির মুখমণ্ডল, ডান হাত ও মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত লাগে। চিকিৎসার অংশ হিসেবে তাঁর মুখে টাইটানিয়ামের প্লেট বসাতে হয়েছে এবং হাতের একটি আঙুল কেটে ফেলতে হয়েছে। গত দুই বছরে তিনি ২৫টিরও বেশি অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, তাঁর সুস্থতার জন্য আরও জটিল পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচার ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রয়োজন, যা বর্তমানে গাজায় সম্ভব নয়।
যুদ্ধের আগে যিনি ক্যামেরা হাতে মানুষের গল্প তুলে ধরতেন, এখন তিনিই নিজের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। তবে তাঁর আশা, যত দ্রুত সম্ভব বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারবেন।
শুধু আল-কাহুজিই নন, একই সংকটে রয়েছেন আরও অনেক ফিলিস্তিনি সাংবাদিক। ফিলিস্তিনি সাংবাদিক সিন্ডিকেটের (পিজেএস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অন্তত ৪০ জন সাংবাদিক গুরুতর আহত বা জটিল রোগে আক্রান্ত, যাদের চিকিৎসা গাজার বাইরে বিশেষায়িত হাসপাতালে প্রয়োজন।
এই দাবিতে সম্প্রতি গাজা সিটিতে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে সাংবাদিক সংগঠনটি। সেখানে নিহত শতাধিক সাংবাদিকের ছবি প্রদর্শনের পাশাপাশি আহতদের দ্রুত বিদেশে পাঠানোর দাবি জানানো হয়। সংগঠনের নেতারা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি চিকিৎসা শেষে সাংবাদিকদের নিরাপদে গাজায় ফিরে আসার নিশ্চয়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
পিজেএসের নেতারা বলেন, চিকিৎসা পাওয়া প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। যুদ্ধ কিংবা অবরোধের কারণে সেই অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।
আরেক ফটোসাংবাদিক মোয়াজ আল-সালহির পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। যুদ্ধ শুরুর আগেই তিনি ক্রোনস রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই সুযোগ আর পাননি। বর্তমানে প্রায়ই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে এবং বারবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে।
তিনি জানান, অনেক সময় চিকিৎসা সরঞ্জাম শরীরে নিয়েই সংবাদ সংগ্রহে বের হতে হয়েছে। এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সংবাদ সংগ্রহের পরিবর্তে নিজেই চিকিৎসার জন্য সংগ্রাম করছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গাজায় ১৮ হাজার ৫০০-এর বেশি রোগীর জরুরি ভিত্তিতে বিদেশে চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু সীমিত সংখ্যক চিকিৎসা সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থার কারণে অধিকাংশ রোগীকেই অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
মানবিক সংস্থাগুলোর মতে, সীমান্তে চলাচলের বিধিনিষেধ এবং স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় গাজার আহত ও জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা পরিস্থিতি দিন দিন আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে।
এ অবস্থায় আহত সাংবাদিকদের দাবি, তাঁরা কোনো বিশেষ সুবিধা চান না; শুধু প্রয়োজন সময়মতো চিকিৎসার সুযোগ, যাতে সুস্থ হয়ে আবারও সত্য তুলে ধরার দায়িত্বে ফিরতে পারেন।