- ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে বিপুল অঙ্কের বকেয়া এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভর উৎপাদন কাঠামোর কারণে বিদ্যুৎ খাতে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে নতুন সরকার। রমজানের পর সেচ মৌসুম ও গ্রীষ্মের বাড়তি চাহিদা সামনে রেখে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ বিভাগের পূর্বাভাস অনুযায়ী, গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়াতে পারে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক কেন্দ্র সচল রেখে সরবরাহ বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, আর্থিক সংকট কাটিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তাঁর ভাষায়, এটি এক ধরনের ‘সংকট ব্যবস্থাপনা’। বিপুল বকেয়া ও জ্বালানি আমদানির প্রয়োজনীয়তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে মোট বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পাওনা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, কয়েক মাস ধরে বিল পরিশোধ না হওয়ায় তারা আর্থিক চাপে রয়েছেন।
পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করীম জানান, দীর্ঘদিন ধরে ভর্তুকি ও রাজস্ব ঘাটতির কারণে বকেয়া জমে এ পর্যায়ে এসেছে। সরকার থেকে ভর্তুকি পাওয়া সাপেক্ষেই ধাপে ধাপে বিল পরিশোধ করা সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট হলেও জ্বালানির সরবরাহ সীমাবদ্ধতা বড় বাধা। উৎপাদনের প্রায় ৮৮ শতাংশ নির্ভর করে গ্যাস, কয়লা ও তেলের ওপর, যার বড় অংশই আমদানিনির্ভর। ডলার সংকটের কারণে এলএনজি, কয়লা ও জ্বালানি তেল আমদানি ব্যাহত হলে উৎপাদনও কমে যেতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি করতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা লাগবে। তাঁর মতে, পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালু রাখতে গেলে বার্ষিক ১৩ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে। ভর্তুকির পরিমাণও উল্লেখযোগ্য—প্রতি ইউনিট বিদ্যুতেই সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
বেসরকারি উৎপাদনকারীদের সংগঠন জানিয়েছে, দ্রুত বকেয়া পরিশোধ না হলে তেল আমদানিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এলসি খোলার পর জ্বালানি দেশে পৌঁছাতে ৪০-৪৫ দিন সময় লাগে। ফলে সময়মতো অর্থ ছাড় না হলে গ্রীষ্মে লোডশেডিং বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যদিকে, কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে সময়মতো সরবরাহ দিতে না পারায় চুক্তি অনুযায়ী জরিমানা (এলডি) ধার্যের বিষয়টি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আমদানিনির্ভর উৎপাদন বাড়িয়ে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, তেলভিত্তিক কেন্দ্র সীমিত ব্যবহার, বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় এবং ভর্তুকি কাঠামো পুনর্বিন্যাসের মতো বহুমুখী কৌশল নিতে হবে।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম মনে করেন, বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম ও অদক্ষতার কারণে ব্যয় বেড়েছে। সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে আর্থিক চাপ কমানো সম্ভব।
এদিকে জ্বালানিমন্ত্রী জানিয়েছেন, আপাতত রমজান ও সেচ মৌসুমে সরবরাহ সচল রাখা অগ্রাধিকার। পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ধাপে ধাপে বকেয়া পরিশোধ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে, বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক ও জ্বালানি—দুই দিক থেকেই যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতে সরকারকে দ্রুত ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।