- ২৯ জুলাই, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন এবং এর সংখ্যালঘু মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা করেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। তবে ফিফার এই উদ্যোগকে ‘ফুটবলের আত্মা বিক্রির চেষ্টা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা।
উয়েফার দাবি, ফুটবল কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। তাই আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে ফুটবলের মালিকানা বা পরিচালন কাঠামোর কোনো অংশ বিক্রির অধিকার ফিফার নেই।
বুধবার (২৯ জুলাই) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে ফিফার নতুন এ পরিকল্পনার তথ্য প্রকাশ করা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও ইভেন্ট কার্যক্রম তদারকির জন্য ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে। নতুন এই প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার।
ফিফা জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতেই রাখা হবে। তবে অতিরিক্ত তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে এর সংখ্যালঘু অংশীদারত্ব বা ‘মাইনরিটি শেয়ার’ বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে সংস্থাটির।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জশুয়া কুশনারের প্রতিষ্ঠিত একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান প্রস্তাবিত বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিতে পারে।
তবে পরিকল্পনাটি প্রকাশ্যে আসার পরই কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায় উয়েফা। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, ফিফার প্রস্তাব এমন একটি সীমা অতিক্রম করেছে, যা ফুটবল পরিচালনাকারী কোনো প্রতিষ্ঠানের করা উচিত নয়।
উয়েফা বলেছে, জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, বিভিন্ন লিগ, ক্লাব, খেলোয়াড়, সমর্থক এবং সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিবৃতিতে উয়েফা আরও জানায়, ফুটবলের আত্মা ও এর পরিচালনব্যবস্থা কোনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য নয়। বিশেষ করে আর্থিক লাভের বণ্টন ও ব্যবহারে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা না থাকলে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠতে পারে।
উয়েফার ভাষ্য, ‘ফুটবলের মালিক আমরা কেউ নই। তাই এটিকে বিক্রি করার অধিকারও কারও নেই।’
তবে নিজেদের পরিকল্পনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ফিফা। সংস্থাটির দাবি, বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে বাড়তি অর্থ সংগ্রহ করে বিশ্বজুড়ে ফুটবলের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। নতুন তহবিল অবকাঠামো উন্নয়ন, কোচিং কার্যক্রম, জাতীয় দল, তৃণমূল পর্যায়ের ফুটবল এবং নারী ফুটবলের প্রসারে ব্যবহার করার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
ফিফার এ পরিকল্পনা ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের মতপার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ফিফা বিশ্বব্যাপী ফুটবলের পরিসর বাড়াতে আর্থিক বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে উয়েফা মনে করছে, বাণিজ্যিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিলে ফুটবলের ঐতিহ্য, স্বচ্ছতা ও পরিচালন কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দুই সংস্থার সম্পর্ক নানা ইস্যুতে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের বিভিন্ন বিষয়েও ফিফা ও উয়েফার মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসে। নতুন বাণিজ্যিক পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে সেই বিরোধে আরও নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
এদিকে ফিফার পরিকল্পনার সমালোচনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তিনি বলেন, বিশ্বকাপ কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আয়োজন। তাই এর মালিকানা বা বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণের কোনো অংশ বিক্রি করার ক্ষমতা কারও থাকা উচিত নয়।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি আরও বলেন, চুক্তিটিকে যে নামেই উপস্থাপন করা হোক না কেন, বিশ্বকাপের কোনো অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হলে তা ফুটবলের মূল আদর্শ ও মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
ফিফার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিশ্ব ফুটবলের বাণিজ্যিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে উয়েফার তীব্র বিরোধিতা এবং ফুটবল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের উদ্বেগের কারণে বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।