Wednesday, August 12, 2026

১৮ শিক্ষক, তবু ১৬ পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল; বেলাবোর মাদ্রাসা নিয়ে ক্ষোভ


ছবিঃ সুটুরিয়া ফজলুল হক খান দাখিল মাদ্রাসা (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। নরসিংদী

নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার সুটুরিয়া ফজলুল হক খান দাখিল মাদ্রাসায় ১৮ জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও চলতি বছরের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৬ শিক্ষার্থীর সবাই ফেল করেছে। শতভাগ ফেল করার এ ঘটনায় ফল প্রকাশের পর থেকেই অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পাঠদান, ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনের বিষয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা।

সোমবার (১০ আগস্ট) ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বিষয়টি সামনে আসে। পাটুলী ইউনিয়নে অবস্থিত ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ মাদ্রাসাটি বর্তমানে এমপিওভুক্ত। চলতি বছরের পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে সাতজন ছাত্রী ও নয়জন ছাত্রসহ মোট ১৬ জন অংশ নিলেও কেউ উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

মঙ্গলবার সরেজমিনে মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায়, মোট শিক্ষার্থী প্রায় ২০০ জন হলেও উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত কম। নবম, দশম ও প্রাথমিক শাখা মিলিয়ে উপস্থিত পাওয়া যায় প্রায় ২০ জন শিক্ষার্থীকে। শিক্ষার্থী সংকটের কারণে একই কক্ষে একাধিক শ্রেণির পাঠদানও চলছে।

প্রতিষ্ঠানটিতে ১০টি শ্রেণিকক্ষ থাকলেও বেশ কয়েকটি কক্ষ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। কোথাও ভাঙাচোরা টিনের স্তূপ, কোথাও জরাজীর্ণ অবকাঠামো। প্রধান শিক্ষকও শ্রেণিকক্ষ ও উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশের সংকটের কথা স্বীকার করেছেন।

তবে অভিভাবকদের অভিযোগ, শুধু অবকাঠামোগত সংকট নয়, শিক্ষকদের অনিয়মিত পাঠদান এবং দায়িত্বে অবহেলাও শিক্ষার্থীদের এমন ফলের অন্যতম কারণ।

দাখিল পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থী সিয়ামের বাবা বাচ্চু মিয়া অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে অসন্তুষ্ট। তাঁর দাবি, শিক্ষকরা নিয়মিতভাবে পাঠদান করেন না এবং এ বিষয়ে অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর কোনো পরিবর্তন হয়নি।

তিনি বলেন, আর্থিক সংকটের মধ্যেও ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। গত বছর ছেলে দুই বিষয়ে ফেল করার পর আবার পরীক্ষা দিলেও এবারও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানের অবস্থার পরিবর্তন চান বলে জানান তিনি।

মাদ্রাসাটির সাবেক শিক্ষার্থী তৌহিদ বলেন, ২০০৭ সালে তিনি যখন সেখানে পড়াশোনা করতেন, তখন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ও শিক্ষার পরিবেশ অনেক ভালো ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থার অবনতি হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।

তাঁর ভাষ্য, এখন ফলাফল খারাপ হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে গেছে। শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি এবং মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির দুর্বল ব্যবস্থাপনাও এ অবস্থার জন্য দায়ী বলে তিনি মনে করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা তৌফাজ্জল হোসেন বলেন, ১৮ জন শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও ১৬ জন পরীক্ষার্থীর একজনও পাস না করাটা অত্যন্ত হতাশাজনক। এ ঘটনার কারণ খুঁজে বের করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে প্রধান শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান এ ফলাফলে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, একসঙ্গে সব শিক্ষার্থীর এমন ফল হওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। যারা ফেল করেছে, তাদের ফল পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।

প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। তাঁর দাবি, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই এবং সীমিত কয়েকটি কক্ষে একাধিক শ্রেণির পাঠদান চালাতে হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়।

আগামী ২০২৭ সালের দাখিল পরীক্ষায় ফলাফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, কী কারণে এবারের এমন বিপর্যয় ঘটেছে, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে বেলাবো উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম ফারুক জানান, শতভাগ ফেল করার কারণ জানতে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠান প্রধানকে ডেকে ফল বিপর্যয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে এবং ভবিষ্যতে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পরিকল্পনা জানাতে বলা হবে।

কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা পাওয়ার পর বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

১৬ পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করার এ ঘটনা এখন বেলাবোর শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু কারণ অনুসন্ধান নয়, শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় দ্রুত কার্যকর পরিবর্তন আনা জরুরি।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন