Saturday, August 15, 2026

ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত কলম্বিয়ার বুয়েনাভেনতুরা, ত্রাণের অপেক্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ


ছবিঃ ১০ আগস্টের ভূমিকম্পে নিজের বাড়ির ক্ষয়ক্ষতি রান্নাঘরের কাউন্টার থেকে দেখছেন লরেনা হিপিস (সংগৃহীত । আল জাজিরা /ইউয়ান ওয়ালেস)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

কলম্বিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলীয় শহর বুয়েনাভেনতুরায় শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে বহু ঘরবাড়ি। সোমবারের ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পে শহরটির অন্তত ৫৪০টি বাড়ি পুরোপুরি ধসে পড়েছে এবং আরও ৩ হাজার ৪১৬টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দুর্যোগের পর পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় সংকট আরও গভীর হচ্ছে।

ভূমিকম্পে দেশজুড়ে আনুমানিক ২৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে বুয়েনাভেনতুরায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ১৯ জন। আহত হয়েছেন আরও প্রায় ৩৩০ জন।

শহরের বাসিন্দা লোরেনা হিপিসের বাড়ির একটি অংশ পাশের পাঁচতলা ভবন ধসে যাওয়ার পর ধ্বংস হয়ে গেছে। তার মায়ের বাড়িও ধসে পড়েছে। ওই ভবনের ধ্বংসস্তূপে চারজনের মৃত্যু হয়।

হিপিস বলেন, ভূমিকম্পের পর তার পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্ক এখন বাকি থাকা ছাদ ও দেয়াল। পাশের ভবনের ধ্বংসাবশেষের ভারে সেগুলোও যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। দ্রুত ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারি সহায়তা চাইলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাননি তিনি।

তার ভাষায়, জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তা আসতে দেরি হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।

ভূমিকম্পের ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বুয়েনাভেনতুরার লুইস অ্যাবলাঙ্কে দে লা প্লাতা জেলা হাসপাতালও। হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ড বর্তমানে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে আহতদের একটি বড় অংশকে হাসপাতালের বাইরে অস্থায়ী তাঁবুতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

২৯ বছর বয়সী ব্রায়ান রেয়েস ভূমিকম্পের সময় প্রথম তলার জানালা দিয়ে লাফিয়ে বের হতে গিয়ে পায়ে তিনটি হাড় ভেঙেছেন। তার অভিযোগ, ভূমিকম্পের আগেও হাসপাতালটিতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবল সংকট ছিল।

রেয়েসের মতে, হাসপাতালের কর্মীদের বেতন পরিশোধ নিয়েও আগে সংকট দেখা দিয়েছিল। চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা বলেও জানান তিনি।

কলম্বিয়ার অন্যতম বড় বন্দরনগরী হলেও বুয়েনাভেনতুরা দীর্ঘদিন ধরেই দারিদ্র্য ও অবকাঠামোগত সংকটে ভুগছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শহরটির ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে ছিলেন। একই সূচকে পার্শ্ববর্তী কালি শহরের হার ছিল ৬ দশমিক ৭ শতাংশ।

স্থানীয় পর্যবেক্ষণ সংস্থা বুয়েনাভেনতুরা কোমো ভামোসের ২০২৫ সালের তথ্য বলছে, শহরের প্রায় ৭২ শতাংশ মানুষ কর্মসংস্থান নিয়ে সমস্যায় ছিলেন। পর্যাপ্ত খাবার না থাকায় প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ নিয়মিত তিন বেলা খাবার খেতে পারতেন না।

ফলে ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারানো মানুষের জন্য পুনর্বাসন এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বুয়েনাভেনতুরার দরিদ্র ব্যারিও ওরিয়েন্তে এলাকার বাসিন্দা বেটসি তেনোরিও ভূমিকম্পে তার দাদা আরনুলফোকে হারিয়েছেন। পক্ষাঘাতে আক্রান্ত থাকায় ভূমিকম্পের সময় তিনি বাড়ি থেকে বের হতে পারেননি। ধসে পড়া বাড়ির নিচে চাপা পড়ে তার মৃত্যু হয়।

তেনোরিও জানান, ভূমিকম্পের দিন মেয়র এলাকা পরিদর্শন করলেও এরপর আর সরকারি সহায়তা পাননি তারা।

তার অভিযোগ, আমরা মাত্র এক ঘণ্টার জন্য সাহায্য পেয়েছি। এরপর স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগেই মূলত সহায়তা পেয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।

স্থানীয় কমিউনিটি অ্যাকশন বোর্ডের সভাপতি আলফনসো গ্রুয়েসোর হিসাব অনুযায়ী, শুধু ব্যারিও ওরিয়েন্তে এলাকাতেই প্রায় ৭৫০ বাসিন্দার বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার দাবি, সরকারি সহায়তা সেখানে এখনো অপ্রতুল।

ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপের পাশাপাশি শহরটিতে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যাপ্ত পুলিশ ও সামরিক সদস্য না থাকায় কিছু এলাকায় লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

ধসে পড়া একটি ভবনের পাশে দায়িত্ব পালন করা পার্কিং কর্মী জর্জ মন্টেজ জানান, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পর সেখানে লুটপাট শুরু হয়।

বুয়েনাভেনতুরার কিছু এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে স্বেচ্ছাসেবকদের পুলিশি নিরাপত্তার প্রয়োজন হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত শহরটিতে সরকারি সহায়তার ঘাটতি নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও স্থানীয়দের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার চিত্রও দেখা যাচ্ছে। শত শত বাসিন্দা স্বেচ্ছায় ত্রাণ কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন।

সমাজকর্মী ইভেথ দালিসা কাসেরেস একটি কমিউনিটি রান্নাঘরের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৪০০ খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন।

তার মতে, বুয়েনাভেনতুরার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য, সহিংসতা ও অবকাঠামোগত সংকটের সঙ্গে লড়াই করে আসছেন। নতুন করে ভূমিকম্প সেই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

তবে এই কঠিন সময়েও স্থানীয় মানুষের ঐক্যই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মনে করছেন তিনি। কাসেরেসের ভাষায়, তারা বারবার পড়ে যান, কিন্তু প্রতিবারই আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন