Saturday, August 15, 2026

ক্ষতিপূরণ ছাড়াই ডুববে ঘরবাড়ি, চিতায় শুয়ে নারীদের প্রতিবাদ ভারতে


ছবিঃ বিক্ষোভকারীরা মধ্যপ্রদেশের কুপি গ্রামের কাছে বার্না নদীর পাশে জড়ো হয়েছে (সংগৃহীত । আল জাজিরা /চন্দ্র প্রতাপ তিওয়ারি)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

ভারতের মধ্যপ্রদেশের পান্না টাইগার রিজার্ভের আশপাশে উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে উচ্ছেদের মুখে পড়েছেন হাজারো মানুষ। তবে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবিতে সবচেয়ে কঠিন অবস্থান নিয়েছেন স্থানীয় নারীরা। দাবি আদায়ে এবার প্রতীকী চিতায় শুয়ে প্রতিবাদ করেছেন তারা।

মধ্যপ্রদেশের কুপি গ্রামের কাছে বারনা নদীর ওপর একটি সেতুর নিচে সম্প্রতি প্রায় ৩০ নারী জড়ো হন। কাঠ সাজিয়ে তৈরি করা হয়েছিল কয়েকটি চিতা। তবে সেগুলোতে আগুন দেওয়া হয়নি। নারীদের ভাষ্য, ক্ষতিপূরণ ও জমির নিশ্চয়তা ছাড়া উচ্ছেদ করা হলে তাদের ভবিষ্যৎ কার্যত মৃত্যুর সমান। সেই বার্তাই দিতে আয়োজন করা হয় ‘চিত্ত আন্দোলন’ নামে পরিচিত এই প্রতিবাদের।

পান্না টাইগার রিজার্ভের ভেতর ও আশপাশের কয়েকটি বসতি ডুবিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ভারতের কেন-বেতওয়া নদী সংযোগ প্রকল্পের অংশ দৌধন বাঁধ নির্মাণকে ঘিরে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১০টি বসতি পানির নিচে চলে যাবে এবং কয়েক হাজার পরিবারকে স্থানান্তরিত হতে হবে।

প্রতিবাদস্থলে ৫০ বছর বয়সী গোঁড় আদিবাসী নারী জ্ঞান রানী গোঁডও একটি প্রতীকী চিতায় শুয়ে ছিলেন। তার পরিবারের কৃষিজমি ও বসতবাড়িও প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পথে।

জ্ঞান রানীর পরিবারের দাবি, তার স্বামী ও বড় ছেলে পুনর্বাসনের অর্থ পেলেও পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা আলাদা কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। জ্ঞান রানী, তার ১৮ বছর বয়সী মেয়ে মুলিয়া এবং প্রয়াত ছেলের স্ত্রী ২১ বছর বয়সী পূজা—কেউই নিজেদের নামে ক্ষতিপূরণের অর্থ পাননি।

জ্ঞান রানীর ভাষায়, তাদের একটি বাড়ি ইতোমধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে। দ্বিতীয় বাড়িটিও ভেঙে ফেলার অপেক্ষায়। কিন্তু সেই বাড়ি হারানোর পর তারা কোথায় যাবেন, তার কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই।

তিনি বলেন, সরকার যদি ক্ষতিপূরণ দিতে না পারে, তাহলে তাদের অন্য কোথাও পাঠানোর ব্যবস্থা করা হোক। কারণ তারা দেশের নাগরিক এবং ভোটার হয়েও নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ তার।

ভারতের ২০১৩ সালের ভূমি অধিগ্রহণ, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন আইনে প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষকে আলাদা পরিবার হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। ফলে প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্যদেরও স্বতন্ত্র ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা।

কিন্তু স্থানীয় নারীদের অভিযোগ, বাস্তবে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের সময় পরিবারের প্রচলিত কাঠামোকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জমির কাগজে নাম না থাকা বা সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার কারণে বহু নারী ক্ষতিপূরণ থেকে বাদ পড়ছেন।

উন্নয়ন অর্থনীতি ও পরিবেশবিষয়ক গবেষক বিনা আগরওয়ালের মতে, আইনের একটি অংশ পরিবারকে প্রচলিত অর্থে সংজ্ঞায়িত করলেও পরবর্তী ব্যাখ্যায় প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ককে পৃথক পরিবার হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। তার মতে, ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিবারের সব প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যের পৃথক ব্যাংক হিসাবে দেওয়া এবং পুনর্বাসনের জমিতে নারীদের সমান মালিকানা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় সবচেয়ে অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছেন পূজা গোঁড। মাত্র এক বছর আগে বিয়ে হয়েছিল তার। পরে তার স্বামী পরশুরাম মারা যান। তাদের একমাত্র সন্তানও পরবর্তীতে মারা যায়।

স্বামীর মৃত্যুর পর পূজা ক্ষতিপূরণের তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার দাবি, কর্মকর্তারা জানান তালিকায় তার নাম নেই। নাম যুক্ত করতে এক লাখ রুপি দাবি করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

অর্থের অভাবে সেই দাবি পূরণ করতে পারেননি পূজা। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেছেন। এক পর্যায়ে নিজের খরচে জেলা শহরেও যান। কিন্তু তার অভিযোগ, কোনো ফল পাননি।

পূজার একটি বাড়ি ইতোমধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে। এখন তিনি শ্বশুরবাড়ির অবশিষ্ট কাঁচা ঘরটিতে থাকছেন। সেটিও ভেঙে ফেলার আশঙ্কায় দিন কাটছে তার।

তার চাওয়া শুধু নগদ অর্থ নয়। পূজার ভাষায়, টাকার বদলে জমি দেওয়া হলে তারা নতুন করে জীবন শুরু করতে পারতেন। বন থেকে দূরে কোনো শহরে চলে যাওয়ার চেয়ে নিজেদের পরিচিত পরিবেশের কাছাকাছি থাকতে চান তিনি।

কুপি ও আশপাশের গ্রামের বহু পরিবার গোঁড আদিবাসী সম্প্রদায়ের। কৃষিকাজের পাশাপাশি বন থেকে মহুয়া, চিরৌঞ্জি ও অন্যান্য বনজ পণ্য সংগ্রহ করে তাদের জীবন চলে।

জ্ঞান রানীর পরিবারের নারী সদস্যরাও প্রতিবছর বন থেকে মহুয়া সংগ্রহ করেন। তাদের কাছে বন শুধু আয়ের উৎস নয়; খাদ্য, ঐতিহ্য ও সামাজিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তাই পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে শুধু নগদ অর্থ দিলেই তাদের জীবনযাত্রার ক্ষতি পূরণ হবে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, নতুন জায়গায় কৃষিজমি, বসতভিটা এবং জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষক অধিকার সংগঠন জয় কিষান সংঘঠনের নেতা অমিত ভাটনাগর দীর্ঘদিন ধরে কেন-বেতওয়া প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে আন্দোলন করছেন। তার দাবি, ক্ষতিপূরণের তালিকা তৈরির সময় এবং বাস্তবে উচ্ছেদের মধ্যে কয়েক বছর পার হয়ে যাচ্ছে। এ সময় পরিবারের সদস্যদের বয়স, বিয়ে, মৃত্যু কিংবা পারিবারিক কাঠামো বদলে গেলেও পুরোনো তালিকাই অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তার দাবি, শত শত নারী, বিশেষ করে বিধবা ও প্রাপ্তবয়স্ক কন্যারা ক্ষতিপূরণের তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। তবে এ সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবিতে ভাটনাগর অনশনও করেছিলেন। পরে জুলাইয়ে তাকে কয়েকশ আন্দোলনকারীর সঙ্গে আটক করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বর্ষাকালে পানির উচ্চতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ওই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলে জানানো হয়েছে।

মধ্যপ্রদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য ক্ষতিপূরণ নিয়ে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। রাজ্যের রাজস্বমন্ত্রী করণ সিং ভার্মা জুলাইয়ে বিধানসভায় জানান, পান্না ও ছত্তরপুর জেলার যোগ্য পরিবারগুলো ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের সুবিধা পেয়েছে।

তবে আন্দোলনের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় রাজ্য সরকারের কাছে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন চেয়েছে। কোথাও কোথাও ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বদলে মধ্যস্বত্বভোগীদের হিসাবে জমা পড়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।

৬ আগস্ট ভারতের কেন্দ্রীয় আদিবাসীবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দুর্গাদাস উইকে পার্লামেন্টে জানান, ক্ষতিপূরণের অর্থ বিতরণের পর তা সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায়নি—এমন নির্দিষ্ট অভিযোগ তার মন্ত্রণালয়ে পাওয়া যায়নি।

এর মধ্যেই দৌধন বাঁধের নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে।

কেন-বেতওয়া ভারতের জাতীয় নদী সংযোগ পরিকল্পনার প্রথম প্রকল্প। দেশটির পরিকল্পনায় এমন প্রায় ৩০টি নদী সংযোগ প্রকল্প রয়েছে। ফলে এই প্রকল্পে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলোতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

সরকারের যুক্তি, প্রকল্পটি খরাপ্রবণ বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে সেচ, পানীয় জল ও বিদ্যুৎ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে পরিবেশবাদী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছেন।

পান্নার পথ ধরে কুপি থেকে আরও ভেতরে গেলে পাওয়া যায় পাঠাপুর গ্রাম। কোথাও বাড়ির দেয়াল অর্ধেক ভাঙা, কোথাও ঘর এখনো দাঁড়িয়ে আছে। ভাঙা বাড়ির পাশে পড়ে আছে টালি ও ইটের স্তূপ। বর্ষার পানিতে ভিজে থাকা সেই ধ্বংসাবশেষের সামনে দাঁড়িয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন একটাই—উন্নয়নের জন্য যদি তাদের ঘর ছাড়তেই হয়, তাহলে নতুন করে বাঁচার নিশ্চয়তা কোথায়?

পূজার কাছে সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো নেই। অবশিষ্ট ঘরটিও একদিন ভেঙে পড়বে—এটা তিনি জানেন। কিন্তু তার পরের ঠিকানা কোথায় হবে, সেটাই এখনো অজানা।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন