- ১৫ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি আলোচনা অচলাবস্থায় থাকায় দেশটির বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ অনির্দিষ্টকাল অব্যাহত রাখার হুঁশিয়ারি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে তেহরানের ওপর নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপ তৈরির কথাও জানিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার বলেছেন, ইরানের বন্দর ঘিরে নৌবাহিনীর উপস্থিতি প্রয়োজন হলে অনির্দিষ্টকাল ধরে বজায় রাখা সম্ভব। জাহাজ পর্যায়ক্রমে বদলি করে এই কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।
একই দিন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, আগামী সপ্তাহে এমন কিছু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ঘোষণা করা হতে পারে, যার নজির আগে দেখা যায়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবে ইরান সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলছে, প্রণালিটি এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং নিজেদের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এটি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না।
ইরানের পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বক্তব্য বাস্তব পরিস্থিতি বদলাতে পারেনি। চলতি সপ্তাহে অল্প কয়েকটি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করতে পেরেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। ফলে এর ওপর দীর্ঘস্থায়ী বাধা তৈরি হলে শুধু ইরান নয়, আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাসের বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ইরান অবরোধ কার্যক্রমে যুক্ত মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জাহাজটির নাবিকদের মানসিক চাপ, ক্লান্তি, প্রয়োজনীয় সরবরাহের ঘাটতি এবং নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ উঠে এসেছে।
এক মার্কিন সিনেটর প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠিতে জানান, রণতরীটি প্রায় সাত মাস ধরে টানা সমুদ্রে রয়েছে। এতে নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও জাহাজটির পরিচালন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ এসব অভিযোগকে অতিরঞ্জিত ও ভুলভাবে উপস্থাপিত বলে দাবি করেছে। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডও জানিয়েছে, রণতরীতে কোনো সেনাসদস্য নিহত হননি। ৩ আগস্ট একজন নাবিক পানিতে পড়ে গেলেও তাকে দ্রুত নিরাপদে উদ্ধার করা হয় বলে জানানো হয়েছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, অত্যাধুনিক পারমাণবিকচালিত বিমানবাহী রণতরীর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দীর্ঘ সময় পরপর বন্দরে নেওয়া প্রয়োজন। সমুদ্রে টানা অবস্থান যত বাড়বে, রক্ষণাবেক্ষণ ও যুদ্ধক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে তত বেশি চাপ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলে তেহরানকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনা। বিশেষ করে দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক আয়ের উৎস তেল রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করাই অবরোধের অন্যতম উদ্দেশ্য।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের কারণে ইতোমধ্যে ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলারের তেল রাজস্ব কমেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও ইরানের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কথা তুলে ধরে অবরোধকে কার্যকর চাপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, শুধু অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে তেহরানকে নতি স্বীকার করানো সহজ হবে না। ইরান পাল্টা হিসেবে মার্কিন সামরিক স্থাপনা বা আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ইরানের হাতে থাকা সবচেয়ে বড় কৌশলগত হাতিয়ারগুলোর একটি। প্রণালিটি দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের বড় অংশ পরিচালিত হওয়ায় এর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপরও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ইরানের কর্মকর্তারা এরই মধ্যে জানিয়েছেন, মার্কিন নৌ অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ করা সম্পদ ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে তারা রাজি নয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যদি দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ বজায় রাখে, তাহলে ওয়াশিংটনের নিজস্ব নৌবাহিনীর ওপরও চাপ বাড়বে। জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ব্যয়ের বিষয়গুলো সামনে আসতে পারে।
ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন শুধু সামরিক শক্তির লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে জ্বালানি, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি দুই পক্ষের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুদ্ধবিরতি আলোচনা দ্রুত কোনো সমাধানে না পৌঁছালে এই অচলাবস্থা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।