- ২৭ জুন, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রতিযোগিতা দিন দিন যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বা ‘সেকেন্ড টাইম’ নিয়ে বিতর্কও। দেশের একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট শর্তে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ থাকলেও শীর্ষ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ। ফলে একই দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ভিন্ন নীতির কারণে প্রতিবছর হাজারো শিক্ষার্থী অনিশ্চয়তা ও হতাশার মুখোমুখি হচ্ছেন।
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), কুয়েট, রুয়েট, চুয়েট এবং বুটেক্সে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ নেই। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট শর্তে দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় অংশ নেওয়া যায়। কোথাও নম্বর কেটে সুযোগ দেওয়া হয়, কোথাও আবার নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ মেনে আবেদন করা যায়।
অনেক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, উচ্চমাধ্যমিক শেষ হওয়ার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় না। পারিবারিক, আর্থিক, শারীরিক কিংবা মানসিক নানা প্রতিকূলতার কারণে প্রথমবার প্রত্যাশিত ফল করা সম্ভব না হলেও পরবর্তী বছরে আর অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ থাকে না।
এক ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী জানান, একটি খারাপ পরীক্ষা বা সামান্য ভুলের কারণে একজনের পুরো শিক্ষাজীবনের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়া উচিত নয়। প্রস্তুতি নিয়ে আবারও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
আরেক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, এক বছর কঠোর পরিশ্রম করার পরও শুধু নীতিগত কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা হতাশাজনক। তার মতে, সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিন্ন ভর্তি নীতি থাকা উচিত।
যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ নেই, তাদের যুক্তি হলো—প্রথমবারের পরীক্ষার্থীদের জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা, ভর্তি জালিয়াতি নিয়ন্ত্রণ এবং ভর্তি শেষে আসন শূন্য হওয়ার মতো প্রশাসনিক জটিলতা এড়ানো।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মতে, একজন শিক্ষার্থী একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার পর পরের বছর অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলে আগের আসনটি ফাঁকা হয়ে যায়। এতে ভর্তি কার্যক্রম জটিল হয়ে পড়ে এবং নতুন শিক্ষার্থীদের জন্যও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম জানিয়েছেন, এটি একক সিদ্ধান্তে পরিবর্তন করার বিষয় নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী ফোরামে আলোচনা করে প্রয়োজন হলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে। তবে এখনই এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দেননি তিনি।
শিক্ষাবিদদের একটি অংশ মনে করেন, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ কোনো নির্দিষ্ট ব্যাচের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় বয়সভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। ফলে একজন শিক্ষার্থী যদি পরবর্তী সময়ে আরও ভালো প্রস্তুতি নিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে তাকে সেই সুযোগ দেওয়া যৌক্তিক।
তারা আরও মনে করেন, প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। যেমন—কোনো শিক্ষার্থী একবার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে একই প্রতিষ্ঠানে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ সীমিত করা যেতে পারে। এতে আসন শূন্য হওয়ার সমস্যা কমবে, আবার মেধাবীরাও দ্বিতীয়বার প্রতিযোগিতার সুযোগ পাবেন।
বিশ্বের অনেক দেশেই একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। জাপানে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজন হলে এক বা একাধিক বছর শুধু ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। চীনের গাওকাও, দক্ষিণ কোরিয়ার সিএসএটি কিংবা ভারতের বিভিন্ন জাতীয় ভর্তি পরীক্ষায়ও নির্ধারিত শর্তে পুনরায় অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব দেশে একটি পরীক্ষার ফলকে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের একমাত্র নির্ধারক হিসেবে দেখা হয় না।
প্রতিবছরই ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ চালুর দাবিতে মানববন্ধন, স্মারকলিপি ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। তাদের দাবি, দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নীতিতে সমতা আনা হোক, যাতে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ একটি মাত্র পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল না থাকে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ থাকবে কি না, সেটি নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয় হলেও দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি সমন্বিত ও অভিন্ন ভর্তি নীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। এতে যেমন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্যের অনুভূতি কমবে, তেমনি উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগও আরও স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত হবে।