- ১৭ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিক্ষোভ সামাল দিতে গিয়ে নতুন ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা, বেকারত্ব ও পরীক্ষার অনিয়মকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলনের পর বিহারের গুরুত্বপূর্ণ একটি আসনে বিজেপির দীর্ঘদিনের আধিপত্যের অবসান ঘটেছে।
৪ আগস্ট রাতে বিহারের রাজধানী পাটনার একটি ভোট গণনাকেন্দ্রে ফল প্রকাশের সময় ঘটে বড় ধরনের রাজনৈতিক অঘটন। প্রায় তিন দশক ধরে বিজেপির দখলে থাকা ব্যাংকিপুর আসনটি এবার জয় করেছে নতুন রাজনৈতিক দল জন সুরাজ পার্টি। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন রাজনৈতিক কৌশলবিদ থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা প্রশান্ত কিশোর।
ব্যাংকিপুরে বিজেপির পরাজয়কে শুধু একটি উপনির্বাচনের ফল হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। এর আগে দেশজুড়ে তরুণদের নেতৃত্বে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, তার প্রভাব বিজেপির ভাবমূর্তিতেও পড়েছে বলে মনে করছেন তারা।
ভারতে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থী আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থার নানা অনিয়ম, বেকারত্ব ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। আন্দোলন দিল্লি ছাড়িয়ে বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতির চাপে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি প্ল্যাটফর্মও গড়ে তোলে।
বিজেপির পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের সমালোচনা করা হলেও পরে দলটির নেতৃত্ব তরুণদের কাছে পৌঁছাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক প্রচারে জোর দেয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকেও তরুণদের উদ্দেশে একাধিক ইনস্টাগ্রাম ভিডিও প্রকাশ করা হয়।
তবে এই প্রচেষ্টা অনেকের কাছে স্বতঃস্ফূর্ত না হয়ে পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রচারণা হিসেবেই ধরা পড়ে। বিজেপির কিছু প্রচারণামূলক ভিডিও নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপও দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, একসময় বিজেপির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার সংগঠিত রাজনৈতিক যোগাযোগব্যবস্থা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দলটির সমর্থকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দিতেন। কিন্তু এখন বিশেষ করে তরুণদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সেই পুরোনো কৌশল আগের মতো কার্যকর হচ্ছে না।
বিশ্লেষক আসিম আলির মতে, মূলধারার গণমাধ্যমে বিজেপির প্রভাব শক্তিশালী থাকলেও ইনস্টাগ্রামসহ নতুন প্রজন্মের প্ল্যাটফর্মে দলটি আগের মতো স্বাভাবিক আবেগ তৈরি করতে পারছে না।
অন্যদিকে গবেষক গিল ভের্নিয়ের মনে করেন, বিজেপির সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা মূলত জনমত ও ভাবমূর্তি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। তার মতে, তরুণদের আন্দোলনের পর বিজেপির রাজনৈতিক কৌশলে মৌলিক পরিবর্তনের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো দেখা যাচ্ছে না।
আগস্টের প্রথম সপ্তাহে তিনটি উপনির্বাচনের মধ্যে দুটি আসনে পরাজিত হয়েছে বিজেপি। বিহারের ব্যাংকিপুরের পাশাপাশি মধ্যপ্রদেশের দাতিয়াতেও দলটি হেরেছে। তবে গুজরাটের মানজালপুর আসন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে তারা।
বিরোধী দলগুলো এই ফলাফলকে তরুণদের আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা কিছুটা সতর্ক। তাদের মতে, উপনির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় কম থাকে। ফলে একটি বা দুটি আসনের ফল দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিজেপির জনপ্রিয়তা কমে গেছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
তবে এসব পরাজয় বিজেপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে দলটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তরুণ প্রজন্মের চোখে মোদির ভাবমূর্তির পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি নেতৃত্ব প্রধানমন্ত্রীকে তরুণদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী জনপ্রিয় নেতা হিসেবে তুলে ধরেছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক আন্দোলন সেই ধারণায় কিছুটা আঘাত করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। ৭৫ বছর বয়সী মোদিকে আন্দোলনকারীদের একাংশ এখন আগের প্রজন্মের রাজনীতির প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
বিশ্লেষক ভের্নিয়েরের ভাষায়, আন্দোলনটি মোদিকে তরুণদের চোখে একজন ‘বুমার’ বা পুরোনো প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরেছে। বিজেপির জন্য এই পরিবর্তনটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তরুণদের আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া প্ল্যাটফর্মটি এখনই সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে নামবে এমন সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে প্রয়োজন বিপুল অর্থ, সংগঠন ও মাঠপর্যায়ের কর্মী। তুলনামূলকভাবে তরুণ ও সাংগঠনিকভাবে দুর্বল এই আন্দোলনের জন্য তা বড় চ্যালেঞ্জ।
বরং শিক্ষার্থী ও তরুণদের দাবিগুলোকে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী এজেন্ডায় ঢুকিয়ে দেওয়াই আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীরাও বলছেন, বিষয়টি শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ বা একটি পরীক্ষার অনিয়মে সীমাবদ্ধ নয়। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বেকারত্ব, শিক্ষা, সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে তরুণদের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভই আন্দোলনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্লেষকদের বড় পর্যবেক্ষণ হলো বিজেপির রাজনৈতিক ক্ষমতা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী। নির্বাচনে জয়, সংগঠন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে ভাঙন ধরানোর ক্ষমতা সব মিলিয়ে দলটির আধিপত্য এখনো অটুট।
তবে সাম্প্রতিক আন্দোলন সেই আধিপত্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
অর্থাৎ, বিজেপি হয়তো এখনো নির্বাচনে শক্তিশালী; কিন্তু জনগণের একটি অংশ, বিশেষ করে তরুণদের সঙ্গে দলটির সম্পর্কের জায়গায় যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, সেটিই আগামী দিনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
একটি উপনির্বাচনের পরাজয় দিয়ে বিজেপির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে ব্যাংকিপুরের ফল এবং তরুণদের আন্দোলন একসঙ্গে যে বার্তা দিচ্ছে, তা হলো শুধু শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো নয়, নতুন প্রজন্মের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতাও ধরে রাখা এখন বিজেপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।