- ১৭ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক ও কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেই হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার নিউইয়র্কে এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ইরানকে পরাজিত করার পর ‘খুব শিগগিরই’ হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণা করা হবে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হয়। ফলে প্রণালিটি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মুখোমুখি অবস্থান বিশ্ববাজারেও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে ইচ্ছা ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ দিয়ে চলাচল করতে পারছে না। তবে সামুদ্রিক চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন অবরোধের মধ্যেও কিছু জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে তেহরান। ইরানের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনো প্রেসিডেন্টের ঘোষণা, সামরিক শক্তি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির মালিকানা পরিবর্তন সম্ভব নয়।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি বলেন, হরমুজ প্রণালি ইরানের ছিল, আছে এবং থাকবে। তার ভাষ্য, প্রণালিটি কখন খোলা বা বন্ধ থাকবে, সে সিদ্ধান্ত ইরানই নেবে।
ইরানের বিচার বিভাগের প্রধানও ট্রাম্পের বক্তব্যের সমালোচনা করে এটিকে ‘অর্থহীন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তেহরানের পক্ষ থেকে একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রতিবেশী ওমানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, মাসকাটের সঙ্গে আলোচনায় শিগগিরই অগ্রগতি আসতে পারে।
তবে প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর সমঝোতার সঙ্গে যুক্ত বলে জানিয়েছে ইরান। বিশেষ করে মার্কিন নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে ঘোষণা দিয়ে হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত করতে পারেন না।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রুস ফেইনের মতে, নতুন কোনো ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করতে হলে সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এর জন্য চুক্তি অনুমোদন বা কংগ্রেসের আইন প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ নাটালি ক্লেইনের মতে, হরমুজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এমন দাবি বাস্তবসম্মত হওয়ার একমাত্র সম্ভাব্য পরিস্থিতি হতে পারে কোনো ধরনের সামরিক দখলদারিত্ব। সে ক্ষেত্রেও ইরানের ভূখণ্ড বা উপকূলীয় এলাকায় কার্যকর মার্কিন সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। এর সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ প্রায় ২১ নটিক্যাল মাইল বা ৩৯ কিলোমিটার।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, উপকূলীয় দেশগুলো সাধারণত তাদের উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত আঞ্চলিক জলসীমার অধিকার ভোগ করে। হরমুজের সরু অংশে ইরান ও ওমানের জলসীমা পরস্পরের ওপর এসে পড়ে। তবে আন্তর্জাতিক প্রণালি হিসেবে এখান দিয়ে জাহাজ চলাচলের অধিকারও স্বীকৃত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন (UNCLOS) অনুমোদন করেনি। তবে আন্তর্জাতিক প্রণালি ও নৌ চলাচলসংক্রান্ত বেশ কিছু বিধান আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের অংশ হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।
ইরানকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও বাড়ছে। রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে মাত্র প্রায় ৩৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধকে সমর্থন করেছেন।
এদিকে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী গোলাবারুদের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে বলে দেশটির বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন এসেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দামও বেড়ে গ্যালনপ্রতি গড়ে ৪ ডলারের বেশি হয়েছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুদ্ধের ক্ষেত্রে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ এখন প্রশাসনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি রয়েছে পরের সারিতে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্য মূলত ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশলের অংশ। তবে বাস্তবে প্রণালিটিকে মার্কিন ভূখণ্ডে পরিণত করা আইনগত ও বাস্তব দুই দিক থেকেই অত্যন্ত জটিল।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির কাতার ক্যাম্পাসের অধ্যাপক পল মাসগ্রেভের মতে, ট্রাম্প প্রায়ই তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে মার্কিন জনগণ ও সমর্থকদের উদ্দেশে শক্ত অবস্থানের বার্তা দেন। ফলে তাঁর কিছু বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার পাশাপাশি আক্ষরিক অর্থে বাস্তবায়নযোগ্য কি না, সেটিও আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।