Wednesday, February 4, 2026

টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে মুখোমুখি বিএনপি–জামায়াত


প্রতীকী ছবিঃ নির্বাচন (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা  

ঢাকা থেকে প্রায় পাঁচশত কিলোমিটার দূরে দেশের দক্ষিণ–পূর্ব সীমান্তের শেষ জনপদ টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ। নাফ নদীর এপারে দাঁড়িয়ে ওপারের মিয়ানমারের অস্থির পরিস্থিতি চোখে পড়লেও এখানকার মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন অন্য জায়গায়—আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

নির্বাচন ঘিরে রাজধানীতে দুটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—একটি, ভোট হলে কোন দলের পাল্লা ভারী হতে পারে; অন্যটি, আদৌ ভোট হবে কি না। বিশেষ করে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের নির্বাচনী পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা নিয়ে ছিল সংশয়। তবে উখিয়া, টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপ ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে সেই আশঙ্কার বাস্তব কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

কক্সবাজার-৪ আসনটি উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলা নিয়ে গঠিত। দক্ষিণে নাফ নদী, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর এবং পূর্বে পাহাড়ঘেরা সীমান্ত—ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই আসন বরাবরই আলোচনায় থাকে। লবণ চাষ ও মাছ ধরা এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা হলেও রোহিঙ্গা সংকট, মাদক ও মানব পাচারের কারণে অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক মনোযোগেও রয়েছে।

এ আসনে এবার চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জেলা জামায়াতের আমির নূর আহমদ আনোয়ারী, ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকে নুরুল হক এবং এনডিএমের সিংহ প্রতীকে সাইফুদ্দিন খালেদ।

মাঠপর্যায়ের আলাপচারিতায় স্পষ্ট হয়েছে, মূল লড়াইটি হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। শাহজাহান চৌধুরী উখিয়ার পরিচিত রাজনৈতিক মুখ, অন্যদিকে নূর আহমদ আনোয়ারী টেকনাফের দীর্ঘদিনের জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত। টানা দুই দশকের বেশি সময় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থাকার সুবাদে আনোয়ারীর রয়েছে শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি।

শাহপরীর দ্বীপের জেটিঘাটে কথা হয় এক প্রবীণ দোকানির সঙ্গে। দীর্ঘদিন বিএনপির সমর্থক হলেও এবার তিনি জামায়াতকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান। তাঁর মতে, আগে যাদের এই আসনে গুরুত্ব ছিল না, তারা এবার সমানতালে লড়াইয়ে এসেছে—এটাই বড় পরিবর্তন।

তবে ভিন্ন মতও আছে। সাবরাং ইউনিয়নের ব্যবসায়ী নুরুল আলম মনে করেন, বিএনপির প্রার্থীই শেষ পর্যন্ত এগিয়ে থাকবেন। নতুন ভোটারদের মধ্যেও ভিন্ন ভিন্ন ভাবনা দেখা গেছে। অটোরিকশাচালক মো. রফিক বলেন, নির্বাচন হলেও আগের মতো উৎসবের আমেজ নেই। তাঁর মতে, একটি বড় রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতিই এর কারণ।

রোববার বিকেলে শাহপরীর দ্বীপে বিএনপির নির্বাচনী সভার প্রস্তুতি চলতে দেখা যায়। শাহজাহান চৌধুরী জানান, এখন পর্যন্ত পরিবেশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের কারণে সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। তিনি কারচুপির শঙ্কার কথাও তুলে ধরেন।

অন্যদিকে উখিয়ার ভালুকিয়া এলাকায় জামায়াত প্রার্থী নূর আহমদ আনোয়ারীর পথসভায় উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা যায়। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর নির্বাচনী ব্যানার ছেঁড়াসহ নারী কর্মীদের হয়রানি করা হয়েছে। তবে তিনি দাবি করেন, তাঁর দল কোনো ধরনের দখল বা কারচুপির পথে যাবে না।

ভোটের অঙ্ক কষলে দেখা যায়, এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭১ হাজারের বেশি। নারী ও পুরুষ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান। স্থানীয়দের মতে, নারী ভোটার, তরুণ ভোটার এবং আওয়ামী লীগের সমর্থকদের অবস্থানই ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।

এর আগে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রভাব ছিল প্রবল। সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি ও তাঁর স্ত্রী শাহীন আক্তারের নাম এখনো আলোচনায় থাকলেও দলটির মাঠপর্যায়ের তৎপরতা চোখে পড়েনি।

বিএনপি প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী আশা করছেন, আওয়ামী লীগের ভোটের একটি অংশ তিনি পাবেন। অপরদিকে জামায়াত প্রার্থী নূর আহমদ আনোয়ারী মনে করেন, অতীত কর্মকাণ্ডের কারণে আওয়ামী লীগের ভোট বিভক্ত হবে।

সব মিলিয়ে সীমান্তঘেঁষা এই জনপদে নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কার চেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভোটের হিসাব আর কে এগিয়ে—কে পিছিয়ে, সেই হিসাবনিকাশ। নাফ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়েও এখানকার মানুষের দৃষ্টি এখন ব্যালটের দিকেই।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন