- ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফিরতে শুরু করেছে পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। এরই অংশ হিসেবে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) থেকে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রথম দিনেই প্রায় ৬ হাজার গ্রাহককে ২৫০ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে ব্যাংকটি।
অমানত ফেরতের পাশাপাশি সোমবার থেকে অনলাইনে অর্থ স্থানান্তর সেবাও চালু করেছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে সংকটে থাকা ব্যাংকটির কার্যক্রমে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক গতি ফিরতে শুরু করেছে।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে নতুন ব্যাংক গঠিত হলেও একীভূত পাঁচ ব্যাংকের শাখাগুলো এখনো পৃথকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশজুড়ে এসব ব্যাংকের মোট শাখা রয়েছে ৭৬১টি।
আমানত ফেরতের জন্য গত ১ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রাহকদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৭৪ হাজার আমানতকারী মোট ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা ফেরতের আবেদন করেন। তাদের আমানত পরিশোধে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দিনে আবেদনকারী গ্রাহকদের একটি অংশ শাখায় এসে টাকা তুলে নেন। তবে আবেদন করা সবাই টাকা তুলতে আসেননি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনেকে জানিয়েছেন, আপাতত তাদের টাকা ব্যাংকেই রাখতে চান। আবার কেউ কেউ টাকা উত্তোলনের পর তা পুনরায় ব্যাংকে জমা দিয়েছেন।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবেদুর রহমান সিকদার বলেন, আবেদন করা সব গ্রাহকের টাকা ফেরতের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে প্রথম দিনে সবাই টাকা তুলতে আসেননি। কেউ কেউ আমানত ব্যাংকে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আবার কয়েকজন উত্তোলনের পর অর্থ পুনরায় জমা দিয়েছেন।
রাজধানীর গুলশান, মহাখালী, বনানী ও মতিঝিলের কয়েকটি শাখা ঘুরে দেখা গেছে, গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত নগদ অর্থের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সকাল থেকেই বিভিন্ন শাখায় টাকা তুলতে গ্রাহকদের উপস্থিতি দেখা যায়। ব্যাংক কর্মকর্তারা ফুল দিয়ে গ্রাহকদের স্বাগত জানান এবং যথাযথভাবে আবেদন করা ব্যক্তিদের অর্থ ফেরত দেন।
একীভূত হওয়া ইউনিয়ন ব্যাংকের উত্তরা শাখার ব্যবস্থাপক এ বি এম মোকাররম মাহমুদ জানান, প্রথম দিনে আটজন গ্রাহক টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন করেন। তাদের মধ্যে চারজন টাকা তুলে নিয়েছেন। অন্যদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব গ্রাহকের মুনাফা জমা রয়েছে, তারাও তা উত্তোলনের সুযোগ পাচ্ছেন।
এর আগে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে থাকা পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার এ উদ্যোগ নেয়। ওই পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সাইফুল আলম, যিনি এস আলম নামে পরিচিত, তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। অপর ব্যাংক এক্সিম ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার।
তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সময়ে এসব ব্যাংকে বড় ধরনের ঋণ অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে দেশি-বিদেশি আর্থিক নিরীক্ষায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক অনিয়মের বিভিন্ন তথ্য সামনে আসে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ ঋণ অনিয়মের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য ও আর্থিক সংকটে পড়ে এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে নতুন কাঠামোয় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে আগের মালিকদের মালিকানা বাতিল করে ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে নেওয়া হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের একীভূতকরণ ও পুনর্গঠনের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আমানত ফেরত ও অনলাইন অর্থ স্থানান্তর সেবা চালুর মধ্য দিয়ে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার প্রক্রিয়া এখন আরও দৃশ্যমান হয়েছে।