- ০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
পানামার সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে, পানামা খালের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর পরিচালনায় চীনা কোম্পানির সঙ্গে করা চুক্তিগুলো সংবিধান পরিপন্থী। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দেওয়া এ রায়ে হংকংভিত্তিক সিকে হাচিসনের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত স্থাপনাগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
রায়ে বলা হয়, রাষ্ট্র ও পানামা পোর্টস কোম্পানি (পিপিসি)-এর মধ্যে বন্দর উন্নয়ন, নির্মাণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত যে ছাড়পত্র ও আইনগত কাঠামো রয়েছে, তা দেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পিপিসি দীর্ঘদিন ধরে পানামা খালের প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রান্তের বালবোয়া এবং আটলান্টিক প্রান্তের ক্রিস্তোবাল কনটেইনার বন্দর পরিচালনা করে আসছে। ১৯৯০-এর দশক থেকে কার্যকর থাকা এসব চুক্তি ২০২১ সালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হয়ে আরও ২৫ বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছিল।
এই রায় এমন এক সময়ে এলো, যখন এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পানামা খালের ওপর চীনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ কার্যত চীনের প্রভাবাধীন হয়ে পড়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
পানামা খাল দিয়ে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের আনুমানিক পাঁচ শতাংশ পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৯ সালে খালটির নিয়ন্ত্রণ পানামার কাছে হস্তান্তর করে। তবে ২০২৫ সালের শুরুতে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ট্রাম্প আবারও পানামার ওপর চাপ বাড়ান—চীনা প্রভাব কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা জোরদার করার আহ্বান জানান।
পিপিসির চুক্তি বাতিলের দাবিতে গত বছর পানামার আদালতে মামলা করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, চুক্তিগুলো অসাংবিধানিক আইনের ভিত্তিতে করা এবং প্রতিষ্ঠানটি যথাযথ কর পরিশোধ করেনি। পরবর্তী অডিটে হিসাবসংক্রান্ত ত্রুটি ও অনিয়ম ধরা পড়ে, যার ফলে চুক্তি নবায়নের পর থেকে পানামার প্রায় ৩০ কোটি ডলার এবং মূল ২৫ বছরের মেয়াদে আনুমানিক ১.২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
আদালতের এই রায়ের ফলে বন্দর পরিচালনা সংক্রান্ত আইনগত কাঠামো নতুন করে সাজাতে হতে পারে এবং ভবিষ্যতে নতুন দরপত্র আহ্বানের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে পিপিসি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং আদালতের রায় প্রত্যাখ্যান করেছে। এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, এই সিদ্ধান্তের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই এবং এটি শুধু তাদের চুক্তিই নয়, বরং বন্দর কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হাজারো পানামাবাসীর জীবিকা ও স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
চীনের পক্ষ থেকেও প্রতিক্রিয়া এসেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, চীনা কোম্পানিগুলোর বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ট্রাম্পের হুমকির পর সিকে হাচিসন বিশ্বজুড়ে তাদের বেশ কয়েকটি বন্দর বিক্রির প্রস্তাব দেয়, যার মধ্যে পানামার বন্দরগুলোও ছিল। প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারের ওই প্রস্তাবিত চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকরকের নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়াম জড়িত ছিল। তবে চীনা সরকারের আপত্তির কারণে চুক্তিটি অগ্রসর হয়নি বলে জানা গেছে।
পানামা ছাড়াও ভেনেজুয়েলা ও গ্রিনল্যান্ডের মতো অঞ্চল নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের ঘোষণা ও কঠোর ভাষা পশ্চিম গোলার্ধে নতুন করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।