- ০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ও অবরোধে বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় এবার নতুন করে আঘাত এসেছে জাতিসংঘ পরিচালিত ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ (UNRWA)-এর ওপর। তীব্র অর্থসংকটের কারণে সংস্থাটি শত শত কর্মীকে চাকরি থেকে বাদ দিয়েছে এবং যারা বহাল আছেন, তাদের বেতন কমিয়ে দিয়েছে—যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে লাখো শরণার্থীর জীবনযাত্রায়।
ইউএনআরডব্লিউএর ঘোষিত কৃচ্ছ্রতা পরিকল্পনার আওতায় গাজায় কর্মরত স্থানীয় কর্মীদের বেতন ২০ শতাংশ কমানো হয়েছে, কাজের সময় হ্রাস করা হয়েছে এবং গাজার বাইরে অবস্থানরত প্রায় ৬০০ কর্মীর চাকরি বাতিল করা হয়েছে। সংস্থাটির কমিশনার জেনারেল ফিলিপ লাজারিনি এক চিঠিতে জানান, ২০২৬ সালের বাজেটে প্রায় ২২ কোটি ডলারের ঘাটতির কারণেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে ইউএনআরডব্লিউএ।
চাকরি হারানোদের মধ্যে রয়েছেন ৫২ বছর বয়সী শিক্ষিকা মরিয়ম শাবান (নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম পরিবর্তিত), যিনি প্রায় ১৮ বছর ধরে ইউএনআরডব্লিউএ পরিচালিত একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। চাকরিচ্যুত হওয়ার খবর পেয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে জানান ঘনিষ্ঠরা।
মরিয়ম জানান, যুদ্ধের সময় তিনি পরিবারসহ গাজার জাবালিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে নুসেইরাতে আশ্রয় নেন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার ২২ বছর বয়সী মেয়েসহ পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হন। হামলায় স্বামী গুরুতর আহত হলে চিকিৎসার জন্য তিনি তাকে নিয়ে মিসরে যান। সেই সুযোগেই তার চাকরি বাতিল করা হয়।
তিনি বলেন, “চিকিৎসার জন্য গাজা ছাড়াই কি অপরাধ হয়ে গেল? সন্তানরা আহত, স্বামী মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে—এর মধ্যেই চাকরি হারালাম। এই সিদ্ধান্ত কোন আইনে নেওয়া হলো?”
গাজার ভেতরে কর্মরত ইউএনআরডব্লিউএ কর্মীরাও একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বেতন কাটছাঁটের ফলে খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় চালানো তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
ইউএনআরডব্লিউএ কর্মী ইউনিয়নের প্রধান ও দীর্ঘ ২৯ বছর ধরে সংস্থাটিতে কর্মরত দন্ত চিকিৎসক মোস্তাফা আল-ঘুল বলেন, “সবচেয়ে বেশি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজাকেই কেন প্রথম বলি দেওয়া হলো? এখানকার মানুষ আগে থেকেই মৃত্যু, ক্ষুধা ও ধ্বংসের মধ্যে আছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, গাজার বাইরে থাকা অনেক কর্মী কোনো নোটিশ ছাড়াই বেতন ও সঞ্চয় থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। “কেউ ক্যানসারে আক্রান্ত, কেউ পুরো পরিবার হারিয়েছে—এদেরই শাস্তি দেওয়া হচ্ছে,” বলেন তিনি।
এই সংকটের পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক অনুদান কমে যাওয়া। ইসরায়েলের অভিযোগের পর বেশ কয়েকটি দাতা দেশ ইউএনআরডব্লিউএ-কে দেওয়া অর্থ স্থগিত করে দেয়। যদিও সংস্থাটি বরাবরই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
গাজায় প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইউএনআরডব্লিউএর সেবার ওপর নির্ভরশীল। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য সহায়তায় সংস্থাটি ছিল তাদের টিকে থাকার অন্যতম ভরসা। বাস্তুচ্যুত গৃহবধূ জিহান আল-হারাজিন বলেন, “যুদ্ধের আগে ইউএনআরডব্লিউএই ছিল আমাদের জীবনরেখা। এখন সেই সহায়তাই বন্ধ হয়ে গেছে।”
ফিলিস্তিনি এনজিও নেটওয়ার্কের পরিচালক আমজাদ শাওয়া বলেন, ইউএনআরডব্লিউএ দুর্বল করা মানে শুধু একটি সংস্থাকে নয়, পুরো শরণার্থী ব্যবস্থাকেই ভেঙে ফেলার চেষ্টা। তিনি অভিযোগ করেন, মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে লক্ষ্য করেই এই চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউএনআরডব্লিউএর ওপর চলমান চাপ ও অর্থসংকট যদি অব্যাহত থাকে, তবে গাজায় মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হবে এবং এর চূড়ান্ত মূল্য দিতে হবে সাধারণ ফিলিস্তিনি জনগণকে।