- ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে আগামী পাঁচ বছরে পেনশন খাতে সরকারের বার্ষিক ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। ২০২৯-৩০ অর্থবছরে এ ব্যয় বেড়ে প্রায় ৫০ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা করছে জাতীয় বেতন কমিশন। ক্রমবর্ধমান এ ব্যয় সামাল দিতে বিদ্যমান পেনশন ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনার সুপারিশ করেছে কমিশন।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৯ লাখ ১৬ হাজার পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৩৪ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা। ২০২৯-৩০ অর্থবছরে পেনশনভোগীর সংখ্যা বেড়ে ১০ লাখ ৪৫ হাজারে পৌঁছাতে পারে। তখন বার্ষিক ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে ৫০ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে পেনশনভোগীর সংখ্যা প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। পাশাপাশি মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘ সময় ধরে পেনশন দিতে হচ্ছে। অনেকেই অবসরের পর ২০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে এ সুবিধা পাচ্ছেন। ফলে সরকারের ওপর পেনশন বাবদ আর্থিক দায় ক্রমেই বাড়ছে।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের বেতন কাঠামোর আওতায় গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পেনশন খাতে সরকারের ব্যয় হয়েছিল ১২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। এ হিসাবে পুরো অর্থবছরে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২৪ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে এ ব্যয় আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কমিশনের পর্যবেক্ষণ, বর্তমান পদ্ধতিতে পেনশন ব্যয় মেটাতে সরকারের রাজস্ব তহবিলের ওপর চাপ বাড়ছে। দীর্ঘ মেয়াদে এ ব্যবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে জাতীয় বাজেটের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণে পেনশন ব্যবস্থাকে আর্থিকভাবে টেকসই করতে বিকল্প কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে কমিশন।
বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারীদের জন্য পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে নির্ধারিত সুবিধাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এ ব্যবস্থায় চাকরির সময় কর্মচারীদের পেনশন তহবিলে নিয়মিত চাঁদা জমা দিতে হয় না। অবসরের পর সর্বশেষ মূল বেতনের ৯০ শতাংশের ভিত্তিতে পেনশন নির্ধারণ করা হয়। এর পাশাপাশি অবসর-পরবর্তী ছুটিসংক্রান্ত সুবিধাও রয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের বাইরেও প্রায় ৯০টি স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের পেনশন সুবিধা চালু রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পেনশন ব্যয়ের বড় অংশ সরকারি অনুদান থেকে মেটানো হয়।
এ পরিস্থিতিতে নতুন সরকারি কর্মচারীদের জন্য চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছে জাতীয় বেতন কমিশন। প্রস্তাব অনুযায়ী, কর্মচারীদের বেতন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কেটে পেনশন তহবিলে জমা করা হবে। একই সঙ্গে সরকারও নির্ধারিত অর্থ ওই তহবিলে দেবে। দীর্ঘ মেয়াদে এই অর্থ বিনিয়োগ করে তহবিলকে স্বনির্ভর করে তোলার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের পেনশন ব্যবস্থার উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক উন্নত দেশ এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এ পদ্ধতিতে কর্মচারী ও নিয়োগদাতা উভয় পক্ষ নিয়মিত অর্থ জমা দেয়। পরে সেই অর্থ সরকারি সিকিউরিটিজ, শেয়ারবাজার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মতো খাতে বিনিয়োগ করা হয়। অবসরের পর তহবিলের অর্থ ও বিনিয়োগ থেকে পাওয়া আয় দিয়ে পেনশন দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কায় কর্মচারীরা বেতনের ৮ শতাংশ এবং সরকার ১২ শতাংশ পেনশন তহবিলে জমা দেয়। পাকিস্তানে কর্মচারীদের চাঁদার হার ১০ শতাংশ এবং সরকারের ১২ শতাংশ। ভারতে কর্মচারীরা ১০ শতাংশ এবং সরকার ১২ থেকে ১৪ শতাংশ অর্থ জমা দেয়। অস্ট্রেলিয়ায় বেতনের অন্তত ১২ শতাংশ পেনশন তহবিলে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। ২০২৫ সালে দেশটির পেনশন সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৩৩ ট্রিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার।
কমিশনের মতে, বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারীদের অনেকে ৩০ বছর বা তারও বেশি সময় চাকরি করেন। তাই চাকরির শুরু থেকেই নিয়মিত চাঁদা জমা হলে দীর্ঘ মেয়াদে বড় অঙ্কের পেনশন তহবিল গড়ে তোলা সম্ভব। যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এ তহবিল দেশের পুঁজিবাজার ও অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের ধাপে ধাপে অভিন্ন চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য বড় তহবিল তৈরি হবে। একই সঙ্গে অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার করার সুযোগ তৈরি হবে।
এর আগে ২০২৩ সালের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইনের আওতায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে উদ্যোগটি বাধার মুখে পড়ে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই উদ্যোগে সরকারি কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনাও হয়নি।
এ অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন ব্যবস্থা চালুর আগে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করার পরামর্শ দিয়েছে কমিশন। পাশাপাশি নতুন নিয়োগ পাওয়া সরকারি কর্মচারী এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য পৃথক চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কর্মচারী ও সরকার উভয়ের নিয়মিত অর্থ জমার পাশাপাশি তহবিলের অর্থ তুলনামূলক নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগ খাতে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তহবিলের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নিয়মিত পর্যালোচনা এবং নতুন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে কমিশন।
এ ছাড়া সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য তহবিলভিত্তিক পেনশন সুবিধা সম্প্রসারণে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও কার্যপরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে বিদ্যমান পেনশন ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা নির্ভর করবে সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।