- ২২ অক্টোবর, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে অনুকূল বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক সংস্কার ত্বরান্বিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার। একই সঙ্গে রপ্তানি পণ্য ও বাজারের বৈচিত্র্য বাড়ানো, তরুণ ও নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ঢাকার উত্তরায় বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) কার্যালয়ে পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসনবিষয়ক (ইএসজি) ড্যাশবোর্ড উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন ডেনিশ রাষ্ট্রদূত।
ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বলেন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ কম থাকা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিরাজ করলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় পড়তে পারেন।
তবে তাঁর বক্তব্য কোনো নির্দিষ্ট সরকারের স্থিতিশীলতা নিয়ে নয়; বরং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও শক্তিশালী ভিত্তি নিয়ে বলে স্পষ্ট করেন তিনি।
বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে মোলার বলেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ দেশকেই নির্ধারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে, যদিও এ প্রক্রিয়ায় সময় লাগতে পারে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ সফলভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে এবং এর মধ্য দিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার সুযোগ পাবে। তাঁর মতে, বিভেদ কমিয়ে সমঝোতার পরিবেশ তৈরি করা এবং স্থিতিশীল সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রদূত বলেন, জ্বালানি সংকটসহ তাৎক্ষণিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সময় ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও জুলাই সনদের তাৎপর্য ভুলে গেলে চলবে না। অতীতে বাংলাদেশ বড় ধরনের সংকট মোকাবিলা করেছে। বর্তমান অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও দেশটি অতিক্রম করতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করে মোলার বলেন, প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা সময়োপযোগী ও কার্যকর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে সংস্কারের পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সম্ভাবনা তুলে ধরে ডেনিশ রাষ্ট্রদূত বলেন, বিজিএমইএর ইএসজি ড্যাশবোর্ড আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা বাড়াতে এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জোরদার করতে ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবেশগত সুরক্ষা, সামাজিক দায়িত্বশীলতা ও সুশাসনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি পরিমাপ এবং তা তুলে ধরার মাধ্যমে পোশাকশিল্পের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশ কেবল কম উৎপাদন খরচের ওপর নির্ভর করতে পারে না। বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মপরিবেশের বিষয়েও গুরুত্ব দেন মোলার। তাঁর মতে, শক্তিশালী মজুরিব্যবস্থা শ্রম ব্যয়কে কেন্দ্র করে সরবরাহকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার সুযোগ নিয়ে ক্রেতাদের শোষণমূলক আচরণ ঠেকাতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের আয় বাড়লে অভ্যন্তরীণ ভোগ বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রেও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
তরুণ ও নারীদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদন ও রপ্তানির ক্ষেত্র সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাও বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অনুষ্ঠানে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু সভাপতিত্ব করেন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত ইএসজি ড্যাশবোর্ডকে পোশাকশিল্পের টেকসই উন্নয়নসংক্রান্ত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের একটি উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়।