Sunday, September 27, 2026

মূল টাকা তুলতেও গ্রাহকের অঙ্গীকারনামা! সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে ক্ষোভ


প্রতীকী ছবিঃ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN

নিজেদের জমানো আমানতের মূল টাকা এককালীন তুলে নিতে গিয়ে নতুন শর্তের মুখে পড়ছেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকেরা। ব্যাংক থেকে মূলধন ফেরত নিতে হলে মুনাফা, সুদসহ অন্যান্য আর্থিক সুবিধার দাবি ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ, দাবি কিংবা আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার লিখিত অঙ্গীকার দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন আমানতকারীরা।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষের এমন শর্তকে একতরফা ও হয়রানিমূলক দাবি করে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেক গ্রাহক। বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে নিজেদের জমা টাকা তুলতে গিয়ে ভবিষ্যতের আর্থিক সুবিধা ও আইনি প্রতিকার পাওয়ার অধিকার ছাড়ার শর্তে অনেকে টাকা না তুলেই ফিরে যাচ্ছেন।

আর্থিক অনিয়ম ও তারল্য সংকটে থাকা পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর থেকে সরকারের উদ্যোগে এই ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, কোনো গ্রাহক তার মূল টাকা একবারে উত্তোলন করতে চাইলে তাকে দুই পৃষ্ঠার একটি ‘আবেদনপূর্বক অঙ্গীকারনামা’তে স্বাক্ষর করতে হচ্ছে। ওই নথিতে উল্লেখ রয়েছে, মূলধন তুলে নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট হিসাবের ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি’ হয়েছে বলে গণ্য হবে।

এর অর্থ হলো, টাকা তুলে নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট আমানতকারী, তার নমিনি, উত্তরাধিকারী কিংবা আইনগত প্রতিনিধি ভবিষ্যতে মুনাফা বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধার দাবি করতে পারবেন না। এমনকি এ নিয়ে ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ, দাবি বা আবেদন করা কিংবা আদালতে মামলা করার পথও বন্ধ থাকবে বলে অঙ্গীকারনামায় উল্লেখ করা হয়েছে। নথিতে আমানতকারীর পাশাপাশি দুজন সাক্ষীর স্বাক্ষরও নেওয়া হচ্ছে।

ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের ১ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮২ জন গ্রাহক আমানত ফেরতের আবেদন করেছেন। এসব আবেদনের বিপরীতে মোট ৬ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা ফেরত চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯০ হাজার ৯৮ জন গ্রাহককে ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

একই সময়ে ব্যাংকটিতে নতুন করে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আমানত এসেছে। পাশাপাশি ৩২ হাজার ৭৪টি নতুন হিসাব খোলা হয়েছে, যেগুলোতে জমা পড়েছে আরও ৩৭৮ কোটি টাকা।

এর আগে গত ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক এক চিঠিতে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের স্থিতির ওপর দুই বছরের মুনাফা কেটে রাখার বা ‘হেয়ারকাট’ করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হলে গত ২৫ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, আমানতের ওপর কোনো হেয়ারকাট থাকছে না। একই সঙ্গে ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতের মূল টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার কথা জানানো হয়।

তবে আমানতকারীদের অভিযোগ, মূল টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হলেও বাস্তবে এককালীন অর্থ ফেরত পেতে গিয়ে তাদের মুনাফা এবং ভবিষ্যতে আইনি প্রতিকার চাওয়ার অধিকার ছাড়তে হচ্ছে। ফলে জরুরি প্রয়োজন না থাকলে অনেকেই এখনই টাকা তুলতে চাইছেন না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, একীভূত ব্যাংকগুলোর দেওয়া ঋণের অর্থ সময়মতো আদায় না হওয়ায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এখনো তারল্য সংকটে রয়েছে। যারা জরুরি প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে আমানত তুলে নিচ্ছেন, তাদের মুনাফা ছাড়তে হচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে অন্য আমানতকারীরা মুনাফাসহ তাদের অর্থ ফেরত পাবেন বলেও জানান তিনি।

এদিকে টাকা ফেরত পেতে শাখা পর্যায়ে নানা ধরনের ভোগান্তির অভিযোগও করছেন গ্রাহকেরা। ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্থ ছাড়ের কথা বলা হলেও বাস্তবে অনেককে দিনের পর দিন শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগী গ্রাহকদের কয়েকজনের দাবি, আবেদন করার পর ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করেও অর্থ ছাড়ের অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও আবার হেয়ারকাট বাতিলের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা শাখায় পৌঁছায়নি—এমন কারণ দেখিয়ে গ্রাহকদের অপেক্ষায় রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এর মধ্যে গত সোমবার ব্যাংকটির পক্ষ থেকে সব বিভাগীয় প্রধান ও শাখা ব্যবস্থাপকদের কাছে ব্যক্তিগত মেয়াদি ও স্কিমভিত্তিক আমানতের মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে নতুন মুনাফার হার এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

একই চিঠিতে যথাযথ কাগজপত্র যাচাই করে মৃত আমানতকারীদের বৈধ দাবিদারদের অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যেসব হিসাব ব্লক করা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত আনব্লক করে স্বাভাবিক লেনদেনের উপযোগী করার কথাও বলা হয়েছে।

ব্যাংকের তারল্য সংকট মোকাবিলা ও আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়ার মধ্যেই মূল টাকা উত্তোলনের সঙ্গে এমন অঙ্গীকারনামার শর্ত যুক্ত হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিজেদের আমানত ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে কতটা দ্রুত ও কী শর্তে পুরো অর্থ দেওয়া হবে—এখন সেটিই আমানতকারীদের প্রধান প্রশ্ন।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন