- ০৭ জুলাই, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। কক্সবাজার
টানা ভারি বর্ষণে কক্সবাজারে একের পর এক পাহাড়ধসের ঘটনায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ১১ জনের প্রাণহানি হয়েছে। নিহতদের মধ্যে উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে ৮ জন, কক্সবাজার শহরে ১ জন, পেকুয়ায় ১ শিশু এবং সদর উপজেলার দরিয়ানগরে ১ নারী রয়েছেন। একই সঙ্গে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজার সদর উপজেলার দরিয়ানগর এলাকায় পাহাড়ধসে এক নারীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় শিশুসহ আরও চারজন আহত হন। এর আগে রোববার গভীর রাত থেকে সোমবার ভোরের মধ্যে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নেও পাহাড়ধসে প্রাণ হারায় সাত বছরের এক শিশু।
সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। রাত দেড়টার দিকে পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে একটি বসতঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘুমন্ত অবস্থায় মাটিচাপা পড়ে একই পরিবারের তিন সদস্য—মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস। দীর্ঘ উদ্ধার অভিযানের পর তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য আহত অবস্থায় উদ্ধার হন।
এর কিছুক্ষণ পর উখিয়ার কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আরেকটি পাহাড়ধসে একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। পরে রাত সাড়ে ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর ক্যাম্পে আরেক দফা পাহাড়ধসে একই পরিবারের চার সদস্য নিহত হন। তারা হলেন উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) এবং হারুনুর রশিদ (৩)।
এদিকে কক্সবাজার শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আলী আকবর নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের খলিফা মুরা আলিম্যার ঝিরি এলাকায় পাহাড়ধসে মিনহাজ উদ্দিন (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়, যা এলাকায় শোকের আবহ সৃষ্টি করেছে।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা জানান, গভীর রাতের প্রতিকূল আবহাওয়া ও দুর্গম পরিবেশের মধ্যেও উদ্ধার অভিযান চালিয়ে একাধিক মরদেহ এবং আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করা হয়েছে। ভারি বৃষ্টির কারণে উদ্ধারকাজে নানা ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান বলেন, উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে সেগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। একই সঙ্গে আবহাওয়ার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে বসবাস না করার জন্য সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।
কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দারা বলছেন, বর্ষা এলেই তাদের জীবন অনিশ্চয়তায় ভরে ওঠে। পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা অস্থায়ী বসতিগুলো ভারি বৃষ্টিতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। প্রতিটি বর্ষায় ভূমিধসের আশঙ্কায় দিন-রাত আতঙ্কে কাটাতে হয় তাদের।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু রোহিঙ্গা শিবির নয়, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও রামুসহ জেলার বিভিন্ন পাহাড়ঘেরা এলাকায় প্রায় তিন লাখ মানুষ এখনও ভূমিধসপ্রবণ স্থানে বসবাস করছেন। টানা বর্ষণে এসব এলাকায় নতুন করে ঝুঁকি বেড়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পাহাড় কাটার ফলে অনেক এলাকায় ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বারবার সতর্ক করা হলেও অসাধু চক্র পাহাড় কাটা বন্ধ করেনি। তার মতে, এই ধরনের অবহেলা ও অবৈধ কর্মকাণ্ডই এমন মর্মান্তিক প্রাণহানির অন্যতম কারণ। তিনি দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
আবহাওয়া পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত থাকায় প্রশাসন পাহাড়সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবী দলগুলোকে সম্ভাব্য যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে।