- ২০ জানুয়ারি, ২০২৬
ইরানজুড়ে সাম্প্রতিক ব্যাপক বিক্ষোভে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি দেওয়ার ঘোষণা অব্যাহত রেখেছে দেশটির শাসকগোষ্ঠী। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ বাক্যবিনিময় চলছে। এর মধ্যেই দেশজুড়ে ইন্টারনেট যোগাযোগ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ অবস্থায় রয়েছে।
ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিচার বিভাগের কার্যক্রম এখন পুরোদমে শুরু হয়েছে। তিনি দাবি করেন, যাদের প্রতি নমনীয়তা দেখানো অনুচিত, তাদের ছাড় দিলে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হবে।
তার এ মন্তব্যের সময় দেশটির বেশিরভাগ এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ ছিল। রোববার অল্প সময়ের জন্য আংশিকভাবে সংযোগ ফিরে এলেও তা আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এজেই সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, তথাকথিত “খুনি ও সন্ত্রাসী উসকানিদাতাদের” বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে যারা বিদেশি শক্তির প্ররোচনায় আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে ‘ইসলামি সহানুভূতি’ দেখানোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে দাবি করেন, ইরান সরকার আট শতাধিক মানুষের ফাঁসি কার্যকর করা থেকে সরে এসেছে। তিনি এই সিদ্ধান্তের প্রশংসাও করেন। এর আগে তিনি সতর্ক করেছিলেন, ইরানে গণহত্যা হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলার পথেও যেতে পারে।
ইরান সরকার বরাবরের মতোই এই বিক্ষোভের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মদদ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে।
শনিবার এক ভাষণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি স্বীকার করেন, বিক্ষোভ চলাকালে “হাজার হাজার মানুষ” নিহত হয়েছে। তবে সরকারপক্ষের দাবি, এসব হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নয়, বরং বিদেশি শক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর কাজ।
গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের কেন্দ্রস্থলে দোকানিদের আন্দোলন থেকে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর থেকে দেশজুড়ে হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন গ্রেপ্তারের খবর দিচ্ছে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ।
ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করা একটি ‘সন্ত্রাসী দল’-এর সদস্যদের তেহরান থেকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া কেরমান, ইসফাহান, মাজানদারান, শিরাজ ও বন্দর আনজালিতে আরও গ্রেপ্তারের খবর দিয়েছে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
দেশটির পুলিশ প্রধান আহমাদরেজা রাদান জানিয়েছেন, যেসব বিক্ষোভকারী ভুল তথ্যের কারণে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন, তারা তিন দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ করলে শাস্তি লাঘবের সুযোগ পেতে পারেন। তবে তিনি কঠোর ভাষায় বলেন, দাঙ্গাকারী ও সন্ত্রাসীদের শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত আইনের আওতায় আনা হবে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বহু আটক ব্যক্তির ‘স্বীকারোক্তি’ প্রচার করা হয়েছে, যদিও আন্তর্জাতিক মহলে এই প্রথা দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচিত।
ইরান সরকার বিক্ষোভে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতির দায় আন্দোলনের সমর্থকদের ওপর চাপানোর কথাও জানিয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির প্রধান মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ বলেন, আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে। ইতোমধ্যে কয়েকজন ব্যবসায়ীর সম্পদ ও জনপ্রিয় ক্যাফে জব্দ করা হয়েছে। সাবেক জাতীয় ফুটবলার ভোরিয়া ঘাফুরির একটি ক্যাফেও এর মধ্যে রয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানে খামেনির দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটানোর আহ্বান জানালে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় তেহরান। ইরানের গার্ডিয়ান কাউন্সিল এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘অশালীন ও ভিত্তিহীন’ বলে আখ্যা দেয় এবং সতর্ক করে জানায়, সর্বোচ্চ নেতার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ ‘লাল রেখা’ অতিক্রমের শামিল হবে।
এ অবস্থায় ইরানে ইন্টারনেট অবরোধ কবে পুরোপুরি প্রত্যাহার হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। প্রেসিডেন্টের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা হোসেইন আফশিন জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে ধীরে ধীরে বিধিনিষেধ শিথিল হতে পারে।