- ০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রণীত জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের জন্য প্রস্তাবিত গণভোটের পদ্ধতিকে অগণতান্ত্রিক বলে অভিহিত করেছে বামপন্থী নয়টি দলের জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঘোষিত ইশতেহার প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জোটটির পক্ষ থেকে এ অবস্থান স্পষ্ট করা হয়।
শুক্রবার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত ইশতেহার পাঠ করেন গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের সমন্বয়ক এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ।
ইশতেহার পাঠের আগে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত জনগণের প্রত্যাশিত জাতীয় নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে প্রকৃত অর্থে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ ছিল না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও জনগণের শাসন নিশ্চিত করাই জোটের প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য বলে জানান বজলুর রশীদ ফিরোজ।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সংবিধানের মৌলিক সংস্কারে গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও সিপিবি, বাসদসহ গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের শরিক দলগুলো জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশ নিয়েছিল, তবে তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি।
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের নেতারা অভিযোগ করেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যেভাবে জুলাই সনদ প্রণয়ন করেছে এবং সংবিধান সংশোধনের বিষয়গুলোকে চারটি প্রশ্নে একত্র করে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাদের মতে, এ পদ্ধতিতে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ না থাকায় প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন ঘটবে না।
বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হলে জুলাই সনদের যেসব বিষয়ে সর্বসম্মতি রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। তবে যেসব বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে, সেসব ইস্যুতে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
গণভোট আয়োজনকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ আট মাসের আলোচনা এবং নোট অব ডিসেন্টের মূল বক্তব্য জুলাই সনদে প্রতিফলিত হয়নি। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। রাষ্ট্রের চার মূলনীতি বহাল রাখার প্রস্তাব উপেক্ষা করা হয়েছে এবং জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নে অঙ্গীকার ও আদালতে যাওয়ার সুযোগ সীমিত করার বিষয়টি নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ঘোষিত ইশতেহারে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট মোট ১৮টি বিষয়ে অঙ্গীকার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের গণমুখী সংস্কার, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা, শ্রমিক অধিকার, নারী অধিকার ও লিঙ্গসমতা, যুব উন্নয়ন, পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষা, বিজ্ঞান ও গবেষণা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক সংহতিভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি।
দেশের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের পর দেশে সহিংসতা বেড়েছে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনায় হামলা, গণমাধ্যম ও নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং অনলাইনে হয়রানির ঘটনা প্রমাণ করে যে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটেনি। এ অবস্থায় জনগণ নতুন করে মুক্তির পথ খুঁজছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতা ও বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, সিপিবির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাকসুর সাবেক ভিপি রাগিব আহসান মুন্না, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদ (মার্ক্সবাদী)-এর কেন্দ্রীয় নির্বাহী ফোরামের সমন্বয়ক মাসুদ রানা এবং জাতীয় গণফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতা আমিরুন নুজহাত মনীষা।