Saturday, June 27, 2026

একের পর এক বন্ধ হচ্ছে পোশাক কারখানা, চাকরি হারিয়ে অনিশ্চয়তায় হাজারো শ্রমিক


ছবিঃ পোশাক কারখানায় কাজ করছেন শ্রমিকেরা (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা 

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প নতুন করে কঠিন সংকটের মুখোমুখি। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে গাজীপুর, সাভারসহ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে কয়েকটি বড় কারখানার কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় হাজারো শ্রমিক হঠাৎ করেই বেকার হয়ে পড়েছেন। খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে আগামী মাসগুলোতে আরও অনেক কারখানা উৎপাদন বন্ধ করতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড স্থায়ীভাবে কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে। আর্থিক সংকট ও ব্যবসায়িক সমস্যার কারণে প্রতিষ্ঠান দুটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক একদিনেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ঈদের ছুটি শেষে কাজে যোগ দিতে এসে চাকরি হারানোর খবর শুনে অনেক শ্রমিক হতবাক হয়ে পড়েন।

ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের অভিযোগ, পূর্বঘোষণা ছাড়াই ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পরও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কিংবা বিকল্প কর্মসংস্থানের কোনো নিশ্চয়তা পাননি তারা।

শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং পোশাক খাতের দীর্ঘদিনের আর্থিক চাপের বহিঃপ্রকাশ। আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি, ডলার সংকট, উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ এবং কাঁচামাল আমদানির জটিলতা একসঙ্গে অনেক কারখানাকে টিকে থাকার লড়াইয়ে দুর্বল করে দিয়েছে।

এদিকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি এবং নিয়মিত ইনক্রিমেন্টের কারণে শ্রম ব্যয়ও বেড়েছে। যদিও এটি শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, তবে উৎপাদনশীলতা সমান হারে না বাড়ায় আর্থিকভাবে দুর্বল অনেক প্রতিষ্ঠান সেই চাপ সামাল দিতে পারছে না।

খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা কার্যক্রম বন্ধ করেছে। এছাড়া ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সাতটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে মোট ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কারখানা ক্রয়াদেশের ঘাটতি ও আর্থিক সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এছাড়া শ্রমিক অসন্তোষ, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং জটিলতা এবং কাঁচামালের ঘাটতিও অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, শুরুতে অর্ডার কমে যাওয়ার প্রভাব থাকলেও পরে তা চলতি মূলধনের সংকটে রূপ নেয়। অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণপত্র (এলসি) খুলতে না পারায় কাঁচামাল আমদানিতে ব্যর্থ হয় এবং উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়নি। তাঁর মতে, কোভিড-১৯ পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাও এই শিল্পের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।

অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, অনেক ক্ষেত্রে শ্রম আইন অনুযায়ী কর্মীদের সব ধরনের পাওনা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হচ্ছে না। তাদের দাবি, ব্যবসায়িক মন্দাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যয় কমানোর জন্য অভিজ্ঞ শ্রমিকদের ছাঁটাই করছে, যার ফলে হাজারো পরিবার জীবিকার সংকটে পড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে সরকারও দক্ষ জনবল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিউএফটির যৌথ উদ্যোগে আগামী তিন বছরে ২২ হাজার ৮১৫ জন পোশাক শ্রমিক ও মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাকে আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ এবং নতুন যন্ত্রপাতি পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। তাই এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা শুধু শ্রমিকদের জীবন-জীবিকাকেই নয়, জাতীয় অর্থনীতিকেও বড় ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তারা মনে করছেন, ঝুঁকিতে থাকা কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সহজ শর্তে অর্থায়ন, ব্যাংকঋণে বিশেষ সুবিধা, উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।

কারখানাগুলোতে উৎপাদনের চাকা সচল রাখা না গেলে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সেই শ্রমিকদেরই, যাদের শ্রমে দাঁড়িয়ে আছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি খাত।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন