- ১৭ আগস্ট, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
বৈদ্যুতিক উড়োজাহাজ, স্বচালিত গাড়ি, ডেলিভারি রোবট ও বৈদ্যুতিক যান সব মিলিয়ে পরিবহন প্রযুক্তির দুনিয়ায় ব্যস্ত সময় পার করছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক ভার্টিক্যাল টেকঅফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং (eVTOL) খাতে সাম্প্রতিক কয়েকটি বড় চুক্তি দেখাচ্ছে, উড়ন্ত ট্যাক্সির ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তি উন্নয়নের পাশাপাশি দ্রুত আয় ও ব্যবসা সম্প্রসারণের পথও খুঁজছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটেছে আর্চার এভিয়েশন ও উইস্ক অ্যারোকে ঘিরে। একসময় প্রতিদ্বন্দ্বী থাকা উইস্ককে এখন অধিগ্রহণ করেছে আর্চার। চুক্তির অংশ হিসেবে বোয়িং উইস্ক অ্যারোসহ আরও দুটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান আর্চারের কাছে হস্তান্তর করবে। বিনিময়ে আর্চারে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ মালিকানা পাবে বোয়িং।
উইস্কের সঙ্গে আর্চারের সম্পর্ক অবশ্য সবসময় এতটা বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। ২০২১ সালে উইস্ক আর্চারের বিরুদ্ধে গোপন তথ্য ও মেধাস্বত্ব চুরির অভিযোগে মামলা করেছিল। প্রায় দুই বছর ধরে চলা আইনি লড়াই পরে সমঝোতার মাধ্যমে শেষ হয়। সেই সমঝোতার পর দুই প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজও শুরু করে।
উইস্কের ইতিহাসও বেশ ঘটনাবহুল। প্রতিষ্ঠানটির শিকড় কিটি হক-এ, যে বৈদ্যুতিক উড়োজাহাজ প্রকল্পের নেতৃত্বে ছিলেন সেবাস্টিয়ান থ্রুন। গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২২ সালে কিটি হক বন্ধ হয়ে গেলেও এর ‘কোরা’ প্রকল্প বোয়িংয়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে টিকে যায়। পরবর্তী সময়ে সেই উদ্যোগের নাম হয় উইস্ক অ্যারো।
অন্যদিকে বৈদ্যুতিক এয়ার ট্যাক্সি নির্মাতা জোবি এভিয়েশনও ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর পথে হাঁটছে। প্রতিষ্ঠানটি ৫০ কোটি ডলারে রেজোন্যান্ট সায়েন্সেস অধিগ্রহণ করেছে। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ও সেন্সর প্রযুক্তিতে কাজ করা এই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে জোবি নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবসা গড়ে তুলবে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘জোবি ডিফেন্স’।
শহুরে পরিবহনের জন্য eVTOL তৈরি ও এর সার্টিফিকেশনের মূল লক্ষ্য থেকে সরে না গেলেও প্রতিরক্ষা খাতে নতুন সম্ভাবনা দেখছে জোবি। কোম্পানিটির ধারণা, এই খাত ভবিষ্যতে প্রযুক্তির পাশাপাশি নতুন রাজস্বের উৎস হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
স্বচালিত পরিবহন প্রযুক্তিতে অংশীদারিত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় উবার এবার উল্টো পথে হেঁটেছে। প্রতিষ্ঠানটি স্বচালিত ডেলিভারি রোবট নির্মাতা সার্ভ রোবোটিকসে থাকা পুরো অংশীদারিত্ব বিক্রি করে দিয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সার্ভ রোবোটিকস উবার থেকেই আলাদা হয়ে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছিল। দুই কোম্পানির ব্যবসায়িক সম্পর্ক অবশ্য এখনো রয়েছে। সার্ভের ডেলিভারি রোবট উবার ইটস প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবহার করা হয় এবং বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত।
তবে উবারের শেয়ার বিক্রির বিষয়টি সার্ভ রোবোটিকস আগে থেকে জানত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রক সংস্থায় উবারের নথি প্রকাশের পরই সার্ভ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় স্বচালিত ট্রাক পরীক্ষার অনুমোদন পেয়েছে অরোরা ইনোভেশন ও কোডিয়াক এআই। রাজ্যটির জনসাধারণের ব্যবহারের সড়কে নিজেদের প্রযুক্তি পরীক্ষা করতে পারবে প্রতিষ্ঠান দুটি। কোডিয়াক ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করেছে।
এদিকে উবার অ্যাপে ডালাসে স্বচালিত যাত্রার সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাভরাইড জানিয়েছে, তাদের স্বচালিত যান উবার প্ল্যাটফর্মে এক লাখের বেশি যাত্রা সম্পন্ন করেছে। তবে এসব গাড়িতে এখনো নিরাপত্তার জন্য একজন মানব অপারেটর উপস্থিত থাকছেন।
ইউরোপেও রোবোট্যাক্সি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে উবার। চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান পনি.এআইয়ের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ইউরোপের চারটি শহরে দুই হাজার রোবোট্যাক্সি নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
স্বচালিত গাড়ির বাজারে আরেক বড় অগ্রগতি এসেছে ওয়েমোর। ক্যালিফোর্নিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের ফলে সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া ও লস অ্যাঞ্জেলেসে ওয়েমোর বাণিজ্যিক রোবোট্যাক্সি সেবা আরও বিস্তৃত এলাকায় পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া স্যাক্রামেন্টো ও সান দিয়েগোতেও সেবা সম্প্রসারণের অনুমোদন পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এসব শহরে এখনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়নি বলে জানিয়েছে ওয়েমো।
অন্যদিকে স্বচালিত গাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে আস্থা বাড়াতে নিজেদের ‘সেফটি কেস ফ্রেমওয়ার্ক’ প্রকাশ করেছে জুক্স। স্বচালিত গাড়ি নিরাপদ এমন দাবি কীভাবে প্রযুক্তিগত ও বাস্তব প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তার একটি কাঠামো এতে তুলে ধরা হয়েছে।
ইলেকট্রিক মোবিলিটি খাতেও বড় বিনিয়োগ দেখা যাচ্ছে। ভারতের বৈদ্যুতিক মোবিলিটি স্টার্টআপ ইউলু সিরিজ-সি বিনিয়োগে ৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে ৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার এসেছে ইক্যুইটি বিনিয়োগ হিসেবে এবং বাকি ৩ কোটি ডলার ঋণ অর্থায়ন।
চিলির মোটরসাইকেলভিত্তিক ঋণসেবা প্রতিষ্ঠান গালগোতেও বিনিয়োগ করছে উবার। মোটরসাইকেল কেনার জন্য গ্রাহকদের ঋণ দেওয়ার কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে ফোর্ড জানিয়েছে, কেনটাকির লুইসভিল অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট আধুনিকায়নে ২০০ কোটি ডলারের প্রকল্প নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এগোচ্ছে। নতুন উৎপাদনব্যবস্থার মাধ্যমে সেখানে ফোর্ডের পরবর্তী প্রজন্মের বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি হবে। এর মধ্যে মাঝারি আকারের ‘ফ্যাথম’ ট্রাকও রয়েছে।
সব মিলিয়ে পরিবহন প্রযুক্তির বর্তমান চিত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণের প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ নেই শিল্পটি। আকাশপথে বৈদ্যুতিক ট্যাক্সি, সড়কে রোবোট্যাক্সি, চালকবিহীন ট্রাক, স্বচালিত ডেলিভারি রোবট এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সব ক্ষেত্রেই একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ চলছে।
তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, নিরাপত্তা, সাইবার হামলা এবং মানুষের আস্থার মতো বিষয়গুলো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে ভবিষ্যতের পরিবহন ব্যবস্থা কেমন হবে, তার উত্তর শুধু প্রযুক্তির সাফল্যে নয় এসব চ্যালেঞ্জ কতটা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করা যায়, তার ওপরও অনেকটাই নির্ভর করছে।