- ১৫ জুলাই, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ পরিশোধ সক্ষমতা এবং অর্থায়নের ঝুঁকি মূল্যায়নে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর সঙ্গে বৈঠক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। বৈঠকে দেশের ঋণ ব্যবস্থাপনা, অর্থছাড়ের ধীরগতি এবং বাজেট সহায়তার প্রবণতাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে আইএমএফ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের ব্যয়, নমনীয় ঋণের প্রাপ্যতা, বাজারভিত্তিক ফ্লোটিং-রেট ঋণের ব্যবহার, গড় ঋণ গ্রহণের খরচ এবং আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধের সম্ভাব্য চাপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে চায়।
বৈঠকে উপস্থিত ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ এখন তুলনামূলক কম ঝুঁকির অবস্থান থেকে মধ্যম ঝুঁকির পর্যায়ে প্রবেশ করছে। তাদের ভাষ্য, স্বল্প সুদ ও নমনীয় শর্তের ঋণের সুযোগ আগের তুলনায় কমে যাওয়ায় নতুন ঋণ গ্রহণ ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে জাপানসহ কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগী আগের মতো সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছে না। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো বহুপাক্ষিক সংস্থার বাজারভিত্তিক সুদে দেওয়া ফ্লোটিং-রেট ঋণের ওপর নির্ভরশীলতাও বাড়ছে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ পোর্টফোলিওর প্রায় ৩০ শতাংশই ছিল ফ্লোটিং-রেট ঋণ। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে এ হার আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কর্মকর্তারা আইএমএফকে আরও জানান, আগামী পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। চলতি অর্থবছর থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশকে প্রায় ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হবে। স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ বাবদ যে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পরিশোধের বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে।
আলোচনায় বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় কমে যাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। আইএমএফ জানতে চায়, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ ছাড়ের গতি কেন কমেছে এবং উন্নয়ন অংশীদারদের বাজেট সহায়তা সাম্প্রতিক সময়ে কেন হ্রাস পেয়েছে।
জবাবে ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, আগের সরকারের সময় অনুমোদিত অনেক প্রকল্প এখন পুনর্মূল্যায়নের আওতায় রয়েছে। পাশাপাশি নতুন বৈদেশিক অর্থায়ননির্ভর প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রেও সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি কিছুটা কমে যাওয়ায় অর্থছাড়েও প্রভাব পড়েছে।
ইআরডির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৪১ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক ঋণ বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ কমেছে।
বাজেট সহায়তার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে আলোচনায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেকর্ড ৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেট সহায়তা পেলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। চলতি অর্থবছরে এ সহায়তা আরও কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কর্মকর্তাদের মতে, কোভিড-১৯ মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় একসময় বাজেট সহায়তা বাড়ানো হলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে এখন সেই প্রবণতায় পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতাও বৈদেশিক অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
উল্লেখ্য, আগের সরকারের সময়ে অনুমোদিত ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি থেকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সরে এসেছে। বর্তমানে সরকার সংশোধিত সংস্কার কর্মসূচির আওতায় ৪ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নতুন তিন বছর মেয়াদি ঋণ সহায়তা পেতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই আইএমএফের প্রতিনিধি দল পাঁচ দিনের সফরে ঢাকায় অবস্থান করছে।