- ১৭ জুলাই, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
মানুষের জীবন বাঁচাতে বারবার ঝাঁপিয়ে পড়া রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত ফায়ার সার্ভিসের দক্ষ ডুবুরি সাদিক হোসেন শুভ এবার আর ফিরলেন না নিজের দায়িত্ব পালন শেষে। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে কর্মরত অবস্থায় নিখোঁজ হওয়ার প্রায় আট ঘণ্টা পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় সহকর্মী, স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকাল ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ নগরীর নিতাইগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর ফায়ার ঘাট সংলগ্ন জেটির সামনে কচুরিপানা পরিষ্কারের কাজ চলছিল। এ সময় স্পিডবোটে দায়িত্ব পালনকালে নদীর ঢেউয়ে ভারসাম্য হারিয়ে পানিতে পড়ে যান নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনের প্রশিক্ষিত ডুবুরি সাদিক হোসেন শুভ (২৬)। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ উদ্ধার অভিযান।
ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা টানা আট ঘণ্টা তল্লাশি চালিয়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে শীতলক্ষ্যা নদীর কেরোসিন ঘাট এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করেন।
ছেলের রাষ্ট্রীয় পদকটি বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাদিকের মা। তিনি বলেন, "আমার বুকের ধন, আমার চোখের মনি আর কোনো দিন ফিরে আসবে না। কিন্তু কীভাবে আমার ছেলে মারা গেল, সেটি আমি জানতে চাই। সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি—আমার সন্তানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্ত করে জানানো হোক।"
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও জানান, ঘটনার দিন সকালে সাদিক তার বাবার কাছে ফোন করে কিছু টাকার প্রয়োজনের কথা বলেছিলেন। কয়েকদিন আগেই মায়ের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল তার। আগামী সপ্তাহে বাড়িতে ফেরারও কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আর পূরণ হলো না।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার কুমড়াকান্দি গ্রামের বাসিন্দা সাদিক ছিলেন পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান। ২০২১ সালে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সে যোগ দেওয়ার পর অল্প সময়েই নিজের দক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। পানিতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে বিশেষ পারদর্শিতার জন্য তিনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ফায়ার সার্ভিস পদক লাভ করেন।
দায়িত্বের পাশাপাশি খেলাধুলাতেও ছিল তার সমান সুনাম। স্থানীয় ফুটবল অঙ্গনে একজন নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন সাদিক। গোয়ালন্দ ফুটবল একাডেমির চেয়ারম্যান মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, সাদিক শুধু ভালো খেলোয়াড়ই ছিলেন না, ব্যক্তিজীবনেও অত্যন্ত ভদ্র, বিনয়ী ও সবার প্রিয় একজন মানুষ ছিলেন। তার মৃত্যু এলাকায় অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করেছে।
সাদিকের চাচা ও গোয়ালন্দ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মো. ফজলুল হক জানান, ঘটনার সময় সাদিকসহ চারজন সদস্য নদীতে কচুরিপানা অপসারণের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। স্পিডবোটের সামনের অংশে অবস্থান করার সময় ঢেউয়ের ধাক্কায় তিনি নদীতে পড়ে যান। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার ঢাকা ফায়ার সার্ভিসের প্রধান কার্যালয়ে জুমার নামাজের পর তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মরদেহ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে সন্ধ্যায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হবে।
জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এক সাহসী ডুবুরির এমন মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, ফায়ার সার্ভিস বাহিনী ও পুরো এলাকার জন্যই গভীর বেদনার কারণ হয়ে উঠেছে।