- ০২ অক্টোবর, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। গোপালগঞ্জ
প্রতিষ্ঠার ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও আবাসন সংকট থেকে বের হতে পারেনি গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (গোবিপ্রবি)। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী থাকলেও পাঁচটি আবাসিক হলে আসন রয়েছে মাত্র ২ হাজার ১৬০টি। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে মেস কিংবা ভাড়া বাসায় থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ৯টি অনুষদের অধীনে ৩৩টি বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। প্রতিবছর নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ায় মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে সেই অনুপাতে আবাসিক হলের আসনসংখ্যা বাড়েনি।
গোবিপ্রবির পাঁচটি আবাসিক হলের মধ্যে বিজয় দিবস হলে ৪০০টি, স্বাধীনতা দিবস হলে ৩৬২টি, শহীদ তিতুমীর হলে ৬০৮টি, বনলতা হলে ৩৪০টি এবং অপরাজিতা হলে ৪৫০টি আসন রয়েছে। সব মিলিয়ে আবাসিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে ২ হাজার ১৬০ জন শিক্ষার্থীর।
এই হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধার বাইরে রয়েছেন। তাদের বড় একটি অংশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় মেস ও ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হলে আসন না পেয়ে বাইরে থাকার কারণে মাসিক বাসাভাড়া, খাবার ও যাতায়াতসহ বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে আবাসনের চাহিদা বাড়ায় আশপাশের এলাকায় মেস ব্যবসাও বিস্তৃত হয়েছে। পর্যাপ্ত বিকল্প না থাকায় অনেক সময় তুলনামূলক বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু মেসে পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। এসব কারণে আর্থিক চাপের পাশাপাশি পড়াশোনার পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
বিশেষ করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ছে বলে জানান শিক্ষার্থীরা। প্রতি বছর নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবাসনের চাহিদা আরও বাড়লেও সেই অনুযায়ী আসন না বাড়ায় সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের অনাবাসিক শিক্ষার্থী লাবিবা তাসফিয়া বলেন, মেয়েদের জন্য আবাসিক হলের আসন ৮০০টিরও কম। এর মধ্যে একটি ছাত্রী হল এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। ফলে অনেক ছাত্রীকে ক্যাম্পাসের বাইরে মেস বা বাসায় থাকতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাসাভাড়া, খাবার ও যাতায়াতের অতিরিক্ত খরচের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ থাকে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কার্যক্রম শেষে বাসায় ফেরার সময় নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। এ কারণে মেয়েদের জন্য নতুন হল নির্মাণের পাশাপাশি অসম্পূর্ণ হলটি দ্রুত চালু করার দাবি জানান তিনি।
অর্থনীতি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের অনাবাসিক শিক্ষার্থী রেদোয়ান ইসলাম সিয়াম বলেন, হলে আসন না পাওয়ায় ক্যাম্পাসের বাইরে থাকার খরচ অনেক পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বাসাভাড়া, খাবার ও যাতায়াতের ব্যয়ের সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
তার মতে, সন্ধ্যার পর বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শেষে বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের বাসায় ফেরার সময় নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। ফলে ইচ্ছা থাকলেও অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন কার্যক্রমে নিয়মিত অংশ নিতে পারেন না। আবাসনকে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক ও নিরাপদ শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করে নতুন হল নির্মাণ এবং বিদ্যমান আসনের স্বচ্ছ বণ্টনের দাবি জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা দিবস হলের প্রভোস্ট সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় পাঁচটি হলে আসনসংখ্যা খুবই কম। এ কারণে অনেক সময় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদেরও আবাসিক সুবিধা দেওয়া সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা আবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে এলেও আসন সংকটের কারণে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয় না। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। তাঁর মতে, ছেলেদের জন্য আরও তিনটি এবং মেয়েদের জন্য দুটি আবাসিক হল নির্মাণ করা গেলে সংকট অনেকটাই কমবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সোহেল হাসান বলেন, ২০১০ সালে কার্যক্রম শুরু হলেও এখনো মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আবাসন সংকট নিরসনে একটি একাডেমিক ভবন, অডিটরিয়াম, একটি ছাত্র হল এবং একটি ছাত্রী হল নির্মাণের জন্য আবেদন করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
উপাচার্য বলেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট অনেকটা কমে আসবে। পাশাপাশি দ্বিতীয় ধাপের ২৫৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ২০২৪ সাল থেকে ঝুলে আছে। ওই প্রকল্পের আওতায় একটি ছাত্রী হলের ওপরের তলার নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। কাজটি সম্পন্ন হলে আরও প্রায় ১০০ ছাত্রী আবাসিক সুবিধা পাবেন।
২০২৭ সালের মধ্যে এসব চলমান কাজ শেষ করে নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন উপাচার্য। তবে শিক্ষার্থীদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত আবাসন সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে আগামী বছরগুলোতে সংকট আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।