- ০৩ নভেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সেন্ট্রাল ভ্যালিতে অভিবাসনবিরোধী অভিযান ঘিরে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বিশেষ করে কৃষিশ্রমিক ও লাতিনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই অঞ্চলটির ২২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অভিবাসন নীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়গুলো রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার বেকার্সফিল্ড শহরের একটি সাধারণ পার্কিং এলাকায় প্রয়াত শ্রমিক অধিকারকর্মী ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা ডলোরেস হুয়ের্তার স্মরণে তৈরি করা হয়েছে একটি স্মৃতিসৌধ। সেখানে রাখা হয়েছে কমলা রঙের গাঁদা ফুল ও প্রার্থনার মোমবাতি। স্থানীয় একটি থিয়েটারের প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে তাঁর জনপ্রিয় স্লোগান ‘সি, সে পুয়েদে’, যার অর্থ ‘হ্যাঁ, এটি সম্ভব’।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিশিল্পে অভিবাসী ও লাতিনো শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন হুয়ের্তা। তিনি ইউনাইটেড ফার্ম ওয়ার্কার্স (ইউএফডব্লিউ) ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেন। ষাট ও সত্তরের দশকে কৃষিশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং কাজের পরিবেশ উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত।
তবে শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের সেই ইতিহাসের পাশাপাশি বর্তমানে সেন্ট্রাল ভ্যালিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযান। গত অক্টোবরের শুরু থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ‘অপারেশন সেভ ক্যালিফোর্নিয়া’ কর্মসূচির আওতায় অঞ্চলটিতে ৪৫ দিনের অভিযান পরিচালনা করছে কেন্দ্রীয় অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। এসব অভিযানে অনেক সময় মুখোশ পরা কর্মকর্তা ও চিহ্নবিহীন যানবাহন ব্যবহার করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
অভিবাসনবিরোধী এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ক্যালিফোর্নিয়ার ২২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের নির্বাচনী প্রচারেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকান দলীয় বর্তমান কংগ্রেস সদস্য ডেভিড ভালাদাওয়ের মুখোমুখি হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী র্যান্ডি ভিলেগাস।
দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চলের রাজনীতিতে প্রভাব ধরে রেখেছেন ভালাদাও। অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাটছাঁট এবং অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযানের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষকে কাজে লাগাতে চাইছেন ভিলেগাস।
আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভিলেগাস বলেন, অভিবাসন অভিযান স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাঁর ভাষ্য, কয়েকজন ব্যবসায়ী তাঁকে জানিয়েছেন, অভিযানের কারণে ক্রেতা কমে যাওয়ায় তাঁদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কেউ কেউ এখন পণ্য সরবরাহের মতো বিকল্প কাজে ঝুঁকছেন। অভিযানের ভয়ে অনেক বাসিন্দা ঘর থেকে বের হতেও সংকোচ বোধ করছেন।
অভিবাসন কর্তৃপক্ষ অবশ্য বর্ণ বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের অভিযান অপরাধীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে। সংস্থাটির দাবি, কারও গায়ের রং, জাতি বা জাতিগত পরিচয় নয়, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অবস্থানই অভিবাসন আইনের আওতায় তাঁকে অভিযানের লক্ষ্যবস্তু করে।
তবে স্থানীয় কৃষিশ্রমিক, শ্রমিক সংগঠন ও অধিকারকর্মীদের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। তাঁদের অভিযোগ, গুরুতর অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে অভিযান চালানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে অনেক সাধারণ শ্রমজীবী মানুষও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
ইউএফডব্লিউর সভাপতি তেরেসা রোমেরো অভিযোগ করেছেন, লাতিনো পরিচয় ও শ্রমজীবী শ্রেণির মানুষ হওয়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সমাজের অংশ হিসেবে বসবাস করা অনেক শ্রমিককে অন্যায়ভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, অভিযানের সময় গাড়ির কাচ ভাঙা এবং কর্মস্থলে যাওয়ার পথে শ্রমিকদের গাড়ি থেকে টেনে নামানোর মতো ঘটনাও ঘটছে।
ফ্রেসনো কাউন্টির এক কৃষিশ্রমিকের স্ত্রী আলজাজিরাকে জানান, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে তাঁর স্বামীকে অভিবাসন কর্মকর্তারা আটক করেন। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, তাঁর স্বামী কোনো অপরাধ করেননি; তিনি শুধু কাজ করেন। এ ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া তাঁদের চার সন্তান আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনলেও তারা ভয় পেয়ে যায় মাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কি না, সেই আশঙ্কায়।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও পরিস্থিতির প্রভাবের কথা জানিয়েছেন। আরভিন শহরের মেয়র অলিভিয়া ক্যালডেরন বলেন, ছোট শহরগুলোতে একজনকে আটক করা হলে দ্রুত সেই খবর ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি কয়েকজন ধর্মযাজক তাঁর কাছে জানতে চেয়েছেন, রোববারও অভিবাসন কর্মকর্তারা অভিযান চালান কি না। অভিযানের ভয়ে অনেক মানুষ গির্জায় যেতেও অনিচ্ছুক বলে জানান তিনি।
নির্বাচনী প্রচারে ভিলেগাস বর্তমান কংগ্রেস সদস্য ভালাদাওয়ের অভিবাসন নীতিসংক্রান্ত অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিইকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আনা একটি বিলে সমর্থন দিয়েছিলেন ভালাদাও। অন্যদিকে ভালাদাওয়ের বক্তব্য, অভিযানে যাঁদের আটক করা হচ্ছে, তাঁদের অনেকেরই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
এই নির্বাচনে দুই দলের প্রার্থীদের সমর্থনে জাতীয় পর্যায়ের নেতারাও প্রচারে অংশ নিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ এবং রিপাবলিকানদের পক্ষে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন ওই অঞ্চলে নির্বাচনী কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। ইউএফডব্লিউসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনও ভিলেগাসের পক্ষে প্রচারে স্বেচ্ছাসেবীদের মাঠে নামিয়েছে।
জনমত জরিপে ভালাদাও ও ভিলেগাসের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এই আসনে ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাশিত সুবিধা কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ভালাদাওয়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান এবং স্থানীয় কৃষি ও ব্যবসায়ী মহলে তাঁর যোগাযোগও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অভিবাসন অভিযান ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিও ভোটারদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ল্যামন্ট শহরের ২৩ বছর বয়সী প্রিসিলা ওর্তেগা বলেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় কর্মস্থলে যাতায়াতের খরচ অনেক বেড়েছে। অতিরিক্ত এই অর্থ পরিবারের খাবার কিংবা প্রয়োজনীয় বিল পরিশোধে ব্যয় করা যেত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সেন্ট্রাল ভ্যালির এই নির্বাচনী লড়াইয়ে তাই শুধু দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এবং স্থানীয় অর্থনীতির ভবিষ্যৎও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডলোরেস হুয়ের্তার শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের স্মৃতি বহন করা অঞ্চলটিতে এসব প্রশ্নই এখন ভোটারদের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।