- ০৩ নভেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে ইউক্রেনে মোতায়েন করা ইউরোপীয় শান্তিরক্ষী বাহিনীর ওপর রাশিয়া হামলা চালালে আত্মরক্ষায় পাল্টা গুলি চালানোর অনুমতি থাকবে যুক্তরাজ্য ও তাদের ইউরোপীয় মিত্রদের সেনাদের। তবে সম্ভাব্য এই বাহিনীর সামরিক পদক্ষেপ হবে মূলত প্রতিরক্ষামূলক। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে গঠিত হওয়ার পরিকল্পনায় থাকা এই স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হলে তা প্রায় পুরোপুরি ইউরোপীয় দেশগুলোর সেনাদের নিয়ে গঠিত হবে। বাহিনীটির কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রযুক্তি বা যোগাযোগব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করার পরিকল্পনাও রয়েছে। বিশেষ করে ইলন মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চলতি মাসের শেষ দিকে পোল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘এক্সারসাইজ কোয়ালিচা’ নামের একটি সামরিক মহড়া। ইউক্রেনে যুদ্ধের অবসান হলে দ্রুত বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েনের সক্ষমতা যাচাই করাই এর মূল উদ্দেশ্য। এতে ১১টি দেশের প্রায় ২ হাজার ৮০০ সেনা, নৌসদস্য ও বিমানবাহিনীর সদস্য অংশ নেবেন।
মহড়ায় ফ্রান্সের প্রথম ডিভিশন থেকে ১ হাজার ৫০০ এবং যুক্তরাজ্যের সপ্তম লাইট মেকানাইজড ব্রিগেড থেকে ৩০০ সেনা অংশ নেবেন। অন্য অংশগ্রহণকারী দেশগুলো হলো পোল্যান্ড, জার্মানি, বেলজিয়াম, এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেন ও তুরস্ক।
বাহিনীটির কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল টম বেটম্যান জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির পর ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও বাধ্যতামূলক নিশ্চয়তা দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ ইউরোপের দেশগুলো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁর মতে, এই মহড়ার মাধ্যমে দ্রুত সেনা মোতায়েন, সামরিক প্রস্তুতি এবং সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা যাচাই করা হবে। এ-সংক্রান্ত পরিকল্পনা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তৈরি করা হচ্ছে।
বেটম্যান আরও জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত বাহিনীটি ন্যাটোর অংশ হবে না। অর্থাৎ এটি পশ্চিমা সামরিক জোটের বাইরে থেকে কাজ করবে। ইউক্রেনে মোতায়েন করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সম্প্রতি ইউক্রেনের সামরিক কাজে ব্যবহৃত স্টারলিংকের উন্নত সংস্করণ স্টারশিল্ড ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। প্রায় ১০ দিন স্থায়ী ওই বিধিনিষেধের কারণে ইউক্রেনের মাঝারি পাল্লার ড্রোন অভিযান প্রভাবিত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অভিজ্ঞতার পর ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের যোগাযোগ ও সামরিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়াতে চাইছে।
তবে ইউক্রেনে ইউরোপীয় সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনাটি এখনো সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির ওপর নির্ভরশীল। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান সংঘাতের অবসানে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। চলতি মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় তিন পক্ষের আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে দুই দেশই একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে। রোববার ও সোমবার ইউক্রেন ও রাশিয়ার বিমান হামলার সতর্কতাব্যবস্থায় সাইবার হামলার ঘটনাও ঘটে। এতে ইউক্রেনের একটি সতর্কবার্তা ব্যবস্থায় সাময়িকভাবে পারমাণবিক ও রাসায়নিক হামলার পাশাপাশি রাস্তায় সংঘর্ষের ভুয়া সতর্কতা ছড়িয়ে পড়ে।
প্রস্তাবিত ইউরোপীয় বাহিনীর অন্যতম দায়িত্ব হবে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করতে সহায়তা করা। তবে পশ্চিমা সেনাদের সম্মুখযুদ্ধের এলাকা থেকে যথাসম্ভব দূরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের বাণিজ্যিক বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালু করতে টহল দেওয়ার জন্য যুদ্ধবিমান ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
কৃষিপণ্য রপ্তানিসহ সামুদ্রিক বাণিজ্য স্বাভাবিক করতে কৃষ্ণসাগরের মাইন অপসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এ কার্যক্রমে তুরস্ক নেতৃত্ব দিতে পারে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
তবে আত্মরক্ষার অধিকার থাকায় ইউরোপীয় সেনাদের ওপর রুশ ড্রোন হামলা বা অন্য কোনো সামরিক আক্রমণ হলে পরিস্থিতি কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনে বিদেশি সেনা মোতায়েনের যেকোনো উদ্যোগ মস্কো কীভাবে নেবে, সেটিও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।