Saturday, September 26, 2026

যুদ্ধের হুমকির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনৈতিক তৎপরতা নিউইয়র্কে


ছবিঃ নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে পৌঁছেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি (সংগৃহীত । আল জাজিরা /চার্লি ট্রিবালু/এএফপি)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন যখন বিশ্বশান্তি ও সংঘাত নিরসনের আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই সেই মঞ্চে ইরানকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে প্রকাশ্য কড়া বক্তব্যের পাশাপাশি জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের পথ খুঁজতে জোর কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে।

মঙ্গলবার জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা না হলে দেশটিকে ‘অ্যানিহিলেট’ বা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার পথে যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিউইয়র্কে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে কয়েক ঘণ্টার আলোচনা হয়। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তেহরানের পক্ষে আলোচনায় যুক্ত ছিলেন।

ট্রাম্প পরে ওই বৈঠককে ‘খুব ভালো’ ও ‘ফলপ্রসূ’ বলে উল্লেখ করেন। তবে মার্কিন পক্ষ জানিয়েছে, আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে যোগাযোগ হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমও আরাঘচি ও উইটকফের যোগাযোগের কথা জানিয়েছে। ফলে বৈঠকের ধরন নিয়ে দুই পক্ষের বর্ণনায় কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ ও নৌ অবরোধ শিথিল না করা পর্যন্ত প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে তারা সম্মত হবে না।

তেহরানের পক্ষ থেকে আলোচনায় কয়েকটি শর্ত তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড় এবং যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ। ইরানের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব বিষয়ে অগ্রগতি হলে হরমুজ দিয়ে নৌ চলাচল পুনরায় চালুর পথও তৈরি হতে পারে।

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি। ফলে এর ওপর দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

নিউইয়র্কে একের পর এক কূটনৈতিক যোগাযোগ হলেও চলতি সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চূড়ান্ত কোনো শান্তিচুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক বিশ্লেষকেরা।

চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিলের মতে, দ্রুত বড় ধরনের সমঝোতা হওয়ার চেয়ে আলোচনার পরিবেশ তৈরি এবং পারস্পরিক আস্থা বাড়ানোর মতো কিছু বোঝাপড়া হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, সামরিক সংঘাত এবং পরস্পরের কঠোর শর্তের কারণে আলোচনায় অগ্রগতি হলেও তা চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাবে কি না, সেটি এখনো অনিশ্চিত।

ইরানের পক্ষ থেকেও আলোচনার প্রতি আগ্রহের কথা বলা হলেও দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন, তেহরান চাপ বা হুমকির কাছে নতি স্বীকার করবে না। একই সঙ্গে তিনি কূটনীতির মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথ খোলা রাখার কথাও বলেছেন।

সংঘাত নিরসনে উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কাতার ও ওমান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখায় দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে তাদের ভূমিকা রয়েছে।

কাতার বিশেষভাবে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানিও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচির সঙ্গে নিউইয়র্কে বৈঠক করেছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে ইরান, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কাতারের পক্ষ থেকে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা কাঠামোর প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটের পাশাপাশি নিউইয়র্কে চীনের ভূমিকাও আলোচনায় রয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পৃথক বৈঠকের জন্য ওয়াশিংটনে গেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং সরাসরি কোনো সমঝোতা চাপিয়ে দেওয়ার অবস্থানে না থাকলেও ইরানের সঙ্গে তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে আলোচনার পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

ইরানের অন্যতম প্রধান তেল ক্রেতা চীন। ফলে হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা এবং ইরানের তেল রপ্তানি স্বাভাবিক থাকা বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, চীন কিংবা উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যস্থতা সহায়ক হতে পারে; শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের ওপর।

বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাত এবং পাল্টাপাল্টি কঠোর হুমকি অব্যাহত, অন্যদিকে একই সময়ে দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা আলোচনায় বসছেন।

ট্রাম্পের ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকির জবাবে ইরানের সামরিক কর্তৃপক্ষ আরও কঠোর পাল্টা হামলার সতর্কবার্তা দিয়েছে। তেহরানের অবস্থান হলো, সামরিক চাপের মধ্যে কোনো আত্মসমর্পণমূলক চুক্তিতে তারা যাবে না। অন্যদিকে ওয়াশিংটন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে আলোচনার অগ্রগতি বোঝার জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হবে নতুন দফার বৈঠক নিশ্চিত হওয়া, দুই পক্ষের মধ্যে ধাপে ধাপে পারস্পরিক পদক্ষেপের বিষয়ে সমঝোতা এবং সর্বোচ্চ দাবি পুনরাবৃত্তির পরিবর্তে চুক্তি বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়া।

তবে হরমুজ প্রণালি নিয়ে মতবিরোধ, যুদ্ধের অবসানের শর্ত এবং দুই দেশের পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর না হলে কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও দ্রুত যুদ্ধবিরতি বা পূর্ণাঙ্গ সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন