- ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে (ইউএনজিএ) আজ বৃহস্পতিবার ভাষণ দিতে যাচ্ছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গাজা যুদ্ধ, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং নিজ দেশে আসন্ন নির্বাচন সব মিলিয়ে এবারের ভাষণকে নেতানিয়াহুর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে নেতানিয়াহুর ১৫তম ভাষণ। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অবস্থান ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখার ক্ষেত্রেও তিনি এই ভাষণকে কাজে লাগাতে পারেন।
সাম্প্রতিক সময়ে গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগও উঠেছে। ইসরায়েল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে এবং তাদের সামরিক অভিযানকে আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে তুলে ধরছে।
নেতানিয়াহুর এবারের সফরও আগের অনেক সফরের তুলনায় সংক্ষিপ্ত। বর্তমান সূচি অনুযায়ী, তিনি নিউইয়র্কে এসে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার পর একই দিন ইসরায়েলে ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এ সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার কোনো বৈঠক নির্ধারিত নেই।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ভাষণে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেতে পারে। ইরানকে ঘিরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের অভিযোগও তিনি তুলে ধরতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি গাজা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘের মঞ্চে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরার কথা আগেই জানিয়েছেন তিনি।
নেতানিয়াহুর জন্য এবারের ভাষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। চলতি বছরের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে তার নেতৃত্ব ও লিকুদ পার্টির জনসমর্থন নিয়ে বিভিন্ন জরিপে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার বক্তব্য ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনাতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
ইসরায়েলের আঞ্চলিক পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান মিতভিমের প্রেসিডেন্ট নিমরোদ গোরেনের মতে, নেতানিয়াহুর ভাষণে আসন্ন নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। তিনি ইরানের হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককেও সামনে আনতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরায়েল ও জাতিসংঘের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক ও টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব, বসতি স্থাপন এবং সামরিক অভিযান নিয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে সমালোচনা হয়েছে। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর এই বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে।
ইসরায়েল জাতিসংঘের বিভিন্ন সমালোচনাকে অনেক সময় পক্ষপাতমূলক বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটি জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ ঘোষণা করেছে এবং জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর কার্যক্রমেও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের মতে, গাজা ও পশ্চিম তীরে মানবিক সহায়তা এবং চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো জিজেট দারকাজালি বলেন, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সমর্থন এবং নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো কাঠামোর সীমাবদ্ধতা জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকার ওপর প্রভাব ফেলছে।
জাতিসংঘে ইসরায়েলের অবস্থানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলবিরোধী বিভিন্ন প্রস্তাবের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দিয়েছে। ফলে জাতিসংঘের ভেতরে ইসরায়েলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থান দুই বিষয়ই এবারের অধিবেশনে আলোচনায় রয়েছে।
এদিকে নিউইয়র্কে নেতানিয়াহুর সফর ঘিরে বিক্ষোভেরও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির সঙ্গে নেতানিয়াহুর প্রকাশ্য মতবিরোধও এবারের সফরকে আরও আলোচিত করেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, নেতানিয়াহু তার ভাষণে মামদানিকে সমালোচনা করতে পারেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এবারের জাতিসংঘ ভাষণে নেতানিয়াহুর সামনে একসঙ্গে কয়েকটি বার্তা তুলে ধরার সুযোগ থাকছে গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের অবস্থান, ইরানকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ, আন্তর্জাতিক সমালোচনার জবাব এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থন। ফলে ভাষণটি শুধু কূটনৈতিক মঞ্চেই নয়, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ব্যাপকভাবে আলোচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।