- ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহুল প্রত্যাশিত বৈঠক আজ বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা প্রশমনের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাইওয়ান এবং ইরান যুদ্ধসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
বুধবার সন্ধ্যায় শি জিনপিং ও তাঁর স্ত্রী পেং লিইউয়ানকে মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে গিয়ে স্বাগত জানান ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। লালগালিচা সংবর্ধনা, সামরিক আনুষ্ঠানিকতা ও উভয় দেশের পতাকার উপস্থিতিতে সেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চীনা প্রেসিডেন্টকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। ছয় দশকের মধ্যে কোনো বিদেশি অতিথিকে এ ঘাঁটিতে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানানোর ঘটনা বিরল বলে উল্লেখ করেছে বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যম।
শির নেতৃত্বে চীনা প্রতিনিধিদলে রয়েছেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ কর্মকর্তা সাই ছি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক হতে পারে।
ট্রাম্প-শি বৈঠকের অন্যতম প্রধান বিষয় হতে পারে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে শুল্ক আরোপ ও পাল্টা পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশ সংঘাত এড়াতে একটি বাণিজ্য সমঝোতার আওতায় রয়েছে। চলমান ১১ মাসের বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ নভেম্বরেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন সেটি আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফলে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের আলোচকরা আরও সময় পাচ্ছেন দীর্ঘমেয়াদি একটি সমঝোতার কাঠামো তৈরির জন্য।
বাণিজ্যের পাশাপাশি চীনের বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থ সরবরাহ, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কেনা এবং দুই দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর সম্ভাব্য কাঠামো নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
দুই দেশের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে থাকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হতে পারে। এআইয়ের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে যোগাযোগের একটি কাঠামো তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশেষ করে এমন কোনো এআই-সংক্রান্ত ঘটনা ঘটলে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করতে পারে, সে বিষয়ে দুই দেশ পরস্পরকে দ্রুত অবহিত করার একটি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে।
এআইকে ঘিরে দুই দেশের প্রতিযোগিতা যেমন তীব্র, তেমনি প্রযুক্তিটির ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তাও উভয় পক্ষ উপলব্ধি করছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
বৈঠকে তাইওয়ান প্রসঙ্গও উঠতে পারে। তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চীন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছিল। আরও প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি প্যাকেজ কয়েক মাস ধরে আটকে আছে। এই অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।
ইরান যুদ্ধও আলোচনায় আসতে পারে। ইরানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ওয়াশিংটন আশা করতে পারে, তেহরানের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব কাজে লাগিয়ে সংঘাত নিরসনে কোনো ভূমিকা রাখা সম্ভব কি না। তবে ট্রাম্প এর আগে প্রকাশ্যে বলেছেন, এ বিষয়ে চীনের সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজন তিনি দেখছেন না।
বৃহস্পতিবার সকালে শি জিনপিংকে হোয়াইট হাউসে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানো হবে। সেখানে সামরিক কুচকাওয়াজ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার পর দুই নেতা বৈঠকে বসবেন। পরে ট্রাম্প ও মেলানিয়া ট্রাম্প চীনা প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রীকে সম্মানে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করবেন।
এই ভোজে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও ব্যবসা খাতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। অ্যাপল, এনভিডিয়া ও ওপেনএআইসহ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
শুক্রবার দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ও তাঁদের স্ত্রীদের মধ্যে হোয়াইট হাউসে চা-আড্ডা এবং ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে শির সফর শেষ হওয়ার কথা।
ওয়াশিংটনে শির এই সফর এক দশকেরও বেশি সময় পর তাঁর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। ট্রাম্প ও শির এক বছরেরও কম সময়ে এটি তৃতীয় সরাসরি বৈঠক। দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও মতবিরোধ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে উভয় পক্ষই সরাসরি যোগাযোগ বজায় রেখে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈঠক থেকে নির্দিষ্ট কিছু খাতে শুল্ক কমানো, মাদক পাচার প্রতিরোধে সহযোগিতা এবং দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মতো উদ্যোগ আসতে পারে। তবে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান ও ইরান নিয়ে মৌলিক মতপার্থক্য থাকায় আলোচনার ফলাফল দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের গতিপথের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।