- ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়নে সড়ক সম্প্রসারণের জন্য একটি ঐতিহাসিক মসজিদের অংশবিশেষ অপসারণকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মসজিদটি ২০২৮ সালের সিমহাস্থ কুম্ভ মেলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সড়ক প্রশস্ত করতে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের প্রতিবাদে কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভ করছেন স্থানীয় মুসলিমরা। সোমবার বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করেছে। এতে অন্তত ১২ জন আহত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।
উজ্জয়নের ছত্রি চক এলাকায় অবস্থিত শাহি মসজিদকে ঘিরে রোববার রাত থেকেই বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। স্থানীয় বাসিন্দা জিশান খান বলেন, মসজিদটি ভেঙে ফেলার আশঙ্কায় তিনি টানা তিন রাত ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই মাস আগে উজ্জয়ন পৌর করপোরেশন মসজিদ কর্তৃপক্ষকে একটি নোটিশ দেয়। এতে সড়ক সম্প্রসারণের জন্য মসজিদের জমি অধিগ্রহণের কথা জানানো হয়। কর্তৃপক্ষ ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে স্থাপনার নির্ধারিত অংশ নিজ উদ্যোগে সরিয়ে নেওয়ার সময়সীমা দিয়েছিল। তা না হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।
মসজিদ কর্তৃপক্ষ পরে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে একাধিক দফায় আলোচনা করে। এর ফলে সড়কের পাশ থেকে প্রথমে দাবি করা সাত ফুটের বেশি অংশের পরিবর্তে প্রায় তিন ফুট জায়গা অপসারণে সমঝোতা হয় বলে স্থানীয়রা জানান।
রোববার রাতে মসজিদের কাছে বুলডোজার আনা হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, কয়েকজন মুসলিম ব্যক্তির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি করা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে বানানো পোস্ট থেকে মসজিদটি পুরোপুরি ভেঙে ফেলার গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এরপর রাতভর সেখানে মানুষের সমাগম হয়।
তবে জিশান খানের অভিযোগ, প্রশাসন এলাকা ঘিরে ফেলে স্থানীয় মুসলিমদের নিজেদের হাতেই মসজিদের অংশ ভেঙে ফেলতে চাপ দেয়। একপর্যায়ে মসজিদ কমিটি নিজ উদ্যোগে স্থাপনার একটি অংশ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কয়েকজন মুসলিম যুবক হাতুড়ি ও লোহার রড ব্যবহার করে মসজিদের পাশের প্ল্যাটফর্মের অংশ ভেঙে ফেলেন।
খান বলেন, নিজেদের হাতে মসজিদের অংশ ভাঙার বিষয়টি স্থানীয় মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল।
সোমবার সকালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়েন। জবাবে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এতে অন্তত এক ডজন মানুষ আহত হন এবং কয়েকজনকে আটক করা হয়।
মঙ্গলবার মসজিদের মিনারের একটি অংশও প্রশাসন অপসারণ করেছে বলে জানান খান। তবে মসজিদের মূল ভবনের ভেতরে এখনো কোনো ভাঙার কাজ শুরু হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
বর্তমানে শাহি মসজিদ ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে প্রশাসন। পুরো এলাকাটি ঘিরে রাখা হয়েছে এবং সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
মসজিদটি অপসারণের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্থানীয় মুসলিমদের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে আবেদন করা হয়েছিল। তবে আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে ২০২৮ সালের সিমহাস্থ কুম্ভ মেলায় বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হবে এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত জায়গার প্রয়োজন হবে বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, উজ্জয়নের ক্ষিপ্রা নদীর তীরে অনুষ্ঠেয় ওই হিন্দু তীর্থ উৎসবকে সামনে রেখে সড়ক প্রশস্ত করা হচ্ছে।
উজ্জয়ন মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভোপাল থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে। রাজ্যটিতে দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় রয়েছে। মসজিদ অপসারণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে চলমান বিতর্কও নতুন করে সামনে এসেছে।
মঙ্গলবার রাজধানী নয়াদিল্লিতেও মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙার প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। ইন্ডিয়ান মুসলিমদের মনিটরিং কমিটির আয়োজনে ওই কর্মসূচিতে কয়েকজন মুসলিম সংসদ সদস্য ও ধর্মীয় নেতা অংশ নেন।
জামায়াতে ইসলামী হিন্দের সভাপতি সৈয়দ সাদাতুল্লাহ হুসাইনি বলেন, বিষয়টি শুধু একটি মসজিদ বা একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো উপাসনালয় আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত না করে ভেঙে ফেলা হলে তা আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে নয়াদিল্লিভিত্তিক একটি দাতব্য সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা আসিফ মুজতবা বলেন, ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে সাম্প্রতিক বিভিন্ন স্থাপনা অপসারণের ঘটনাকে অনেক মুসলিম যুক্ত করে দেখছেন। মসজিদ নিয়ে বিতর্ক, মাদ্রাসার ওপর চাপ এবং মুসলিম প্রতিষ্ঠান ঘিরে বিভিন্ন বিরোধের কারণে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে মধ্যপ্রদেশের বিজেপির দুই মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।