- ০৩ জুলাই, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে নতুন করে সক্রিয় আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। সমীক্ষা, প্রকৌশল নকশা, পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে কারিগরি সহযোগিতা দিতে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে বেইজিং। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ শুধু অর্থায়ন বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর নয়, বরং আঞ্চলিক কূটনীতি ও প্রতিবেশী দেশগুলোর অবস্থানের ওপরও অনেকাংশে নির্ভর করবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনার মহাপরিকল্পনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিতে চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ প্রকল্পের সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপেই অংশ নিতে চায় দেশটি।
তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশে বহু বছর ধরে আলোচনা হলেও নানা কারণে এর বাস্তব অগ্রগতি সীমিত ছিল। অতীতে প্রকল্পের প্রাথমিক সমীক্ষার কিছু কাজ সম্পন্ন হলেও তা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দিকে এগোয়নি। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আঞ্চলিক রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভারতের আপত্তিই এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এদিকে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিও এখনও অনিষ্পন্ন। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে গেলেও চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প সফল করতে পানিবণ্টন ইস্যুতেও দুই দেশের মধ্যে কার্যকর সমাধান গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে উন্নয়ন অগ্রাধিকারের অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করছে। সরকারপ্রধান তারেক রহমানও দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন বক্তব্যে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, নদীশাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, বাংলাদেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই তিস্তা প্রকল্পে সহায়তার বিষয়ে চীন ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। তিনি জানান, এ সহযোগিতা উন্নয়নমূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেওয়া হচ্ছে এবং এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।
ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা তিস্তা নদী উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীশাসন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
এ ছাড়া রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, নদীভাঙন কমানো, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নদীকেন্দ্রিক শিল্প ও পর্যটনের বিকাশের সম্ভাবনাও তৈরি হবে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নদীর গভীরতা বৃদ্ধি, প্রশস্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং পুনরুদ্ধার করা জমিকে উৎপাদন ও উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহারের বিষয়েও আলোচনা রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তিগত নয়; বরং কৌশলগত। দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শক্তির স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করে বাংলাদেশকে এগোতে হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক হুমায়ুন কবিরের মতে, তিস্তা প্রকল্প ও অর্থনৈতিক করিডোরের মতো উদ্যোগগুলো এখন কেবল উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলগত সমীকরণের অংশ। তাই জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে বহুপাক্ষিক সম্পর্ক দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারলেই এ ধরনের বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হবে।